বৈধ ব্যবসার আড়ালে চলছে কারবার

চাঁপাইয়ে হুন্ডির টাকায় গরু, মাদক ও অস্ত্র

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বেপরোয়াভাবে চলছে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন। প্রতি মাসে শত কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে এ অবৈধ পথে। এতে মোটা অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। বছরে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার রিজার্ভ অর্থ থেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। এসব টাকা হুন্ডি ব্যবসায়ীরা গরু, মাদক, অস্ত্র, সোনাসহ বিভিন্ন চোরাচালানে ব্যবহার হচ্ছে। এর পেছনে সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

বিভিন্ন তথ্য মতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরসহ সীমান্ত অঞ্চলে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচারে রয়েছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিদিন টাকা পাচার হচ্ছে। এই নেটওয়ার্ক বিদেশেও বিস্তৃত। বিদেশ গমন, চিকিৎসা ব্যয় মেটানো, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা, বৈদেশিক কেনাকাটায় লেনদেন চলছে হুন্ডির মাধ্যমে। গরু, মাদক, অস্ত্র, সোনাসহ বিভিন্ন চোরাচালানের লেনদেনে চলছে হুন্ডির ব্যবহার। এজন্য কোটি কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য আটক করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেই প্রতি বছরে প্রায় ১৪০০ কোটি টাকা অবৈধ পথে লেনদেন হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস সূত্র জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে ৬০ হাজারেরও বেশি প্রবাসী কর্মী বিভিন্ন দেশে রয়েছেন। এ জেলা থেকে প্রায় ৪৫ হাজার কর্মী রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে। যার ন্যূনতম মাসিক আয়ের যোগফল প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা। এসব বৈদেশিক অর্থের ৯০ ভাগ টাকাই দেশে প্রবেশ করছে হুন্ডির মাধ্যমে। মানিলন্ডারিংয়ে মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ভারত, আর ভারত থেকে গরু-অস্ত্র-মাদক হয়ে এসব অর্থ প্রবেশ করছে বাংলাদেশে। এই চক্রের সঙ্গে জড়িত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শতাধিক ব্যক্তি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জে বৈধ ব্যবসার আড়ালে চলছে হুন্ডি ব্যবসা। প্রশাসনের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রযুক্তি না থাকায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে অপরাধীরা। তবে এ মাধ্যমে টাকা সহজ উপায়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যায়। অভিযোগ রয়েছে, প্রবাসীরা বৈধ উপায়ে নানা হয়রানির কারণে হুন্ডিকেই বেছে নিচ্ছেন। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা আদান-প্রদান অবৈধ বা রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ এ বিষয়ে ধারণা নেই অনেকের।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় একাধিক বিট-খাটাল রয়েছে। এসব বিট-খাটালের মাধ্যমে সীমান্তপথ দিয়ে পাচার হয়ে আসে ভারতীয় গরু। তবে দুই দেশের ব্যাপারীদের অলিখিত সমঝোতার ওপরেই চলছে এ গরুর ব্যবসা। গরু আনতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের নগদ অর্থের দরকার হয় না। গরু পাঠিয়ে দেওয়ার পর হুন্ডিতে মূল্য পরিশোধ করেন তারা।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর সূত্রে জানা গেছে, গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে হুন্ডি ব্যবসা প্রতিরোধে ৫ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান পরিচালনা। স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের সক্রিয়তা আরো বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সুপারিশে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দেশের বৈধ চ্যানেলে স্বল্প খরচে ও দ্রুততম সময়ে টাকা পাঠানোর নিশ্চয়তা বিধানের কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি হুন্ডি কারবারে সন্দেহভাজন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের নজরদারিতে আনার কথাও বলা হয়েছে।

হুন্ডি চক্রকে প্রতিরোধ করতে না পারাটাই দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ অপরাধ থামাতে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার টি এম মোজাহিদুল ইসলাম জানান, হুন্ডিতে মূলত এজেন্টের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়। এটি পুরোপুরি চলে বিশ্বাসের ওপর। এখানে কোনো কাগজপত্রের লেনদেন হয় না। এ প্রক্রিয়ায় টাকা পাচার হওয়ায় পাচারকারীদের শনাক্ত করা খুবই কঠিন কাজ। অপরাধীরা এর সুযোগ নিচ্ছে। তবে এর কারণ অনুসন্ধান ও হুন্ডি কারবারিদের চিহ্নিত করতে কাজ করছে পুলিশ। দ্রুত হুন্ডি কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান পুলিশ সুপার।

 

"