মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত গ্রাহক

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

কম সময়ে লেনদেনের কারণে মোবাইল ব্যাংকিং এখন আর্থিক লেনদেনের জনপ্রিয় মাধ্যম। দ্রুত টাকা প্রাপ্তি ও পাঠানোর সুযোগ করে দিচ্ছে এই ব্যাংকিং পদ্ধতি। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এ মাধ্যমটির নিরাপত্তা দিন দিন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। গ্রাহক তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ না হওয়ায় অনিরাপদ হয়ে উঠছে এই ব্যাংকিং লেদদেন। এজেন্ট পয়েন্টগুলো থেকে গ্রাহকের তথ্য চুরি করে প্রতারণার কাজে ব্যবহার করছে অপরাধীরা। এ প্রতারণার ফাঁদে পড়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা। দেশে ডিজিটাল প্রতারণার একেবারে শীর্ষে অবস্থান করছে মোবাইল ব্যাংকিং খাতটি। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে শুধু লেনদেন নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন অনেক সেবা। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল অর্থাৎ সেবামূল্য পরিশোধ, কেনাকাটার বিল পরিশোধ, বেতন-ভাতা প্রদান, বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিংসেবা এখন গ্রাহক পছন্দের সেরা মাধ্যম। মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুসারে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক সংখ্যা ছয় কোটি ছাড়িয়েছে। এ সেবার মাধ্যমে গড়ে প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। প্রযুক্তিগত সুবিধার অপব্যবহার করে ১৬টি মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের প্রতারিত করতে গড়ে উঠেছে বিশাল প্রতারকচক্র। চক্রের সঙ্গে জড়িতদের বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার করে আইনের আওতায়ও আনা হয়েছে। তবু থামছে না প্রতারণা। সম্প্রতি এ ধরনের প্রতারণার শিকার হন শাজাহানপুরের রইস উদ্দিন। গত ১০ জানুয়ারি এক এজেন্টের মাধ্যমে মেয়ের কাছে পাঁচ হাজার টাকা পাঠান তিনি। ১০ মিনিট পর তার মেয়ের কাছে পরপর দুটি মেসেজ আসে। একজন ফোন করে তাকে বলে, ভুলে পাঁচ হাজার টাকা করে ১০ হাজার টাকা চলে গেছে। পাঁচ হাজার টাকা ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করেন প্রতারক। সরল বিশ্বাসে পাঁচ হাজার টাকা ‘সেন্ডমানি’ করেন রইস উদ্দিনের মেয়ে। পরে ব্যালেন্স পরীক্ষা করে দেখেন, তার অ্যাকাউন্টে আর কোনো টাকা নেই।

গত ৫ মার্চ একইভাবে প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সাড়ে ৪১ হাজার টাকা খুইয়েছেন ঢাকা জেলা জজ আদালতের এক শিক্ষানবিস আইনজীবী তরিক ইসলাম। তাকে বলা হয়, আপনার বিকাশ অ্যাকাউন্টে অবৈধভাবে ১০ হাজার টাকা ঢুকেছে। এ টাকা না দিলে অ্যাকাউন্টটি বন্ধ থাকবে। কলটি কেটে দিয়ে তরিক একাধিকবার তার বিকাশ অ্যাকাউন্টে ঢোকার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে দুই দফায় ২৫ হাজার টাকা পাঠানোর পর বুঝতে পারেন তিনি প্রতারিত হয়েছেন।

এভাবেই রইস উদ্দিন ও তরিক ইসলামের মতো প্রতিদিন সারা দেশে শত শত লোক মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। পরে থানায় মামলা-জিডি কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। অভিযোগ আছে, মোবাইল ব্যাংকিং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া এ ধরনের প্রতারণা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে কত টাকা আছে এবং তার যাবতীয় তথ্য প্রতারকদের জানার কথা নয়। দিনের পর দিন প্রতারণা চলছে। হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে গ্রাহকের হাজার থেকে লাখ টাকা। তবু যেন দেখার কেউ নেই।

বিভিন্ন কেস স্টাডি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, প্রতারিত গ্রাহকদের বেশির ভাগই শিক্ষিত কিন্তু সহজ-সরল প্রকৃতির। আর এ কারণেই লোকলজ্জার ভয়ে থানা পুলিশের অভিযোগ তো দূরের কথা, পরিচিতদেরই ঘটনাটি জানাতে চান না। আবার সারা দেশে প্রতারকচক্রের বিস্তার শনাক্ত করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে টাকা হাতিয়ে নেওয়া ওই চক্রটি। যদিও বিকাশসহ মোবাইল ব্যাংকিংসেবা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে গ্রাহকদের বারবার সতর্ক করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে জানা গেছে, প্রথমত, গ্রাহকের কাছে ফোন করে তথ্য হালনাগাদের কথা বলে পিন নম্বর বা সিকিউরিটি কোড কৌশলে নিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। এরপর গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে থাকা সব টাকা খুব সহজেই নিজেদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে নিচ্ছে। গ্রাহক তথ্য হালনাগাদ করতে না চাইলে প্রথম দিকে বড় ধরনের প্রলোভন দেখায়। এতেও যদি কাজ উদ্ধার না হয় তাহলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে বলে হুমকি দিয়ে থাকে। এতে অনেক গ্রাহক হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে পিন নম্বর দিয়ে দিচ্ছে। আর তখনই সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে ওই গ্রাহকের।

প্রতারক চক্রের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না পুলিশ, আইনজীবী, ডাক্তার, সাংবাদিক, ইঞ্জিনিয়ারসহ কেউই। ধনী ব্যক্তিরা কয়েক হাজার টাকা প্রতারণার শিকার হলে তাদের যায় আসে না। কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষরা যখন দিন শেষে রোজগার করে পরিবারের জন্য পাঁচ শ বা হাজার টাকা পাঠান আর ওই টাকা যখন প্রতারকচক্র কৌশলে হাতিয়ে নেয়, তখন ওই পরিবারের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। অনেক অসহায় পরিবার প্রতারণার শিকার হয়ে সারা দিন বা সারা রাত না খেয়েও থাকেÑ এমন অনেক ঘটনা আছে। এ রকম প্রতারক চক্রের ব্যাপারে সবার সাবধান হওয়া উচিত। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার টিমের আরো সক্রিয় ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা প্রতারণার বিষয়ে বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংকে ব্যবহার করে গ্রাহক হয়রানি বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়েছে। তাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশনস শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানই চায় না তাদের গ্রাহক প্রতারিত হোক। প্রতারণা থেকে বাঁচতে তিনি সব গ্রাহককে আরো সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন।

১৫ ধরনের অপরাধ কর্মকান্ডের অর্থ লেনদেনে মোবাইল ব্যাংকিং : অপরাধীরা অর্থ লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করছে। ১৫ ধরনের অপরাধ কর্মকান্ডের অর্থ লেনদেনে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার চিহ্নিত করা হয়েছে। মাদক ব্যবসা, মানবপাচার, চোরাচালান, চাঁদাবাজি, হত্যা, অপহরণ, হুন্ডি, জালিয়াতি, জিনের বাদশা, হ্যালো পার্টি, প্রতারণা, মুক্তিপণ আদায়, প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রবাসীদের জিম্মি করে টাকা আদায় ও ধর্মভিত্তিক জঙ্গি কর্মকান্ডের মতো অপরাধের ঘটনায় টাকা লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং।

প্রতারণা ধরতে কাজ করছে পাঁচটি ইউনিট : সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ছাড়াও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রতারণা ও অবৈধ লেনদেন চিহ্নিত এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কাজ করছে পাঁচটি ইউনিট। এই ইউনিটগুলো হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট, র‌্যাব, সিআইডি ও গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তার বিষয়টি মূলত প্রযুক্তিনির্ভর। যেসব প্রতিষ্ঠান এই সেবার সঙ্গে জড়িত প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদেরই দায়িত্ব। পাশাপাশি গ্রাহকের অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয় পুলিশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য : দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ৬ কোটি এক লাখ ৫২ হাজার। তবে নিবন্ধিত গ্রাহকদের মধ্যে অনেকের হিসাবই সক্রিয় নেই। সক্রিয় গ্রাহক ২ কোটি দুই লাখ ৬২ হাজার।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গত জানুয়ারি মাসে লেনদেন হয়েছে ৩৪ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। গত জানুয়ারি পর্যন্ত গড়ে প্রতিদিন লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। সর্বশেষ ১৮টি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকরা দেশ-বিদেশে লেনদেন করতে পারতেন। বর্তমানে ১৬টির মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রয়েছে।

 

"