স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ রুট চট্টগ্রাম!

মধ্যপ্রাচ্য বসে নিয়ন্ত্রণ : সক্রিয় ৮ সিন্ডিকেট

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

তাজুল ইসলাম পলাশ, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে এক দিনেই মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ৩১ কোটি টাকার ৭০০ পিস স্বর্ণের বার উদ্ধারের ঘটনায় নড়ে-চড়ে বসেছে প্রশাসন। চালানগুলো এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। চট্টগ্রামের প্রবাসীদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। যাদের অনেকেই এসব ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন নন, তাদের দিয়েই এসব চোরাচালানের কাজে ব্যবহার করা সহজ। এমন আরো বড় বড় চালান আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পার পেয়েছে বলে সন্দেহ অনেকের। এ ঘটনায় পুলিশ চারজনকে আটক করলেও মূল হোতারা রয়েছে অধরায়। পুলিশের ধারণা স্বর্ণ বহনকারীদের পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। যারা দেশে এবং বিদেশে বসে অনায়াসে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম মহানগর ডিবি পুলিশের বন্দর জোনের উপকমিশনার এস এম মোস্তাইন হোসাইন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, স্বর্ণের সঙ্গে জড়িত চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাঠে কাজ করছে পুলিশের টিম। জড়িত অন্যদের আটক করা সম্ভব হবে। শুল্ক গোয়েন্দার একটি সূত্র জানায়, দেশের প্রধান দুই বিমানবন্দরকে ঘিরে দেশি-বিদেশি অন্তত আটটি প্রভাবশালী স্বর্ণ চোরাচালানি চক্র সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা শাহজালালে চারটি, চট্টগ্রাম শাহ আমানতে তিনটি ও সিলেটে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয়।

কীভাবে, কেমন করে এসব স্বর্ণ দেশে এলো তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা। এত স্বর্ণের চালান আগে কখনো চোখে পড়েনি বলেও মত তার। গত সোমবার ৪ মার্চ চট্টগ্রামের হালিশহর পুলিশ লাইনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দুই দফায় চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করছি। এ মহাসড়ক (ঢাকা-চট্টগ্রাম) দিয়ে যাওয়া কত ইয়াবা-হেরোইনের চালান জব্দ করেছি। কিন্তু এত বড় স্বর্ণের চালান কখনো আমাদের হাতে ধরা পড়েনি। এভাবে ওপেন একটা স্বর্ণের চালান যেতে পারে তা আমরা কল্পনাও করিনি। আমার চাকরি জীবনে এমনটা ঘটেনি।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. কামরুজ্জামান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, জব্দ স্বর্ণের বারগুলোর প্রতিটি ২২ ক্যারেটের। এতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম খোদাই করা আছে। ধারণা করা হচ্ছে, আরব আমিরাত থেকে এদিন স্বর্ণের একটি বড় চালান এসেছে। এর মধ্যে ভাগ করে পাচার করতে গিয়ে দুটি প্রাইভেটকারের চালান ধরা পড়ে। এর আগে হয়তো আরো চালান যেতে পারে। তবে গ্রেফতার ব্যক্তিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চোরা কারবারি দলের সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামে প্রভাবশালী কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। বিদেশে বসা সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাদের যোগসাজশ রয়েছে। সিভিল অ্যাভিয়েশনের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য চক্রটির সঙ্গে জড়িত।

অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে স্বর্ণের চোরা কারবারিরা। বিমান ও বিমানবন্দরের কর্মীদের সহায়তায় এ বন্দর ব্যবহার করে তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে অবৈধভাবে স্বর্ণ আনছেন।

সূত্র জানায়, ২০১৪-১৭ সাল পর্যন্ত দেশের বিমানবন্দরে দেড় হাজার কেজির বেশি পরিমাণ স্বর্ণের বার জব্দ হয়। এছাড়া গত এক বছরে (চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত) শুধু চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বর্ণের বারের ১৪টি বড় চালান ধরা পড়ে। প্রায় ৮০ কেজি ওজনের এসব স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত নভেম্বরে ছয়টি চালানে মোট ৯ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়।

এর আগে ২০১৪ সালে কয়েক দফায় প্রায় ২৫৪ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। বিমানবন্দর কাস্টমসের হিসেবে উদ্ধার এসব স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১২৭ কোটি টাকা। আশঙ্কার কথা হলো, গত এক বছরে বিমানবন্দর দিয়ে আসা ১৪ চালানে যে পরিমাণ স্বর্ণের বার জব্দ হয়েছে, গত রোববার সড়কে জব্দ মাত্র দুই চালানেই তার চেয়ে বেশি স্বর্ণ জব্দ হয়। যার আনুমানিক মূল্য ৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

সূত্র বলছে, চট্টগ্রামকে স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নেওয়ার অনেকগুলো কারণ আছে। এর অন্যতম কারণ প্রবাসী অধ্যুষিত চট্টগ্রামের অধিকাংশ মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকে। শ্রমিক শ্রেণির এসব মানুষকে সহজেই স্বর্ণ চোরাচালানের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

নাম জানাতে অনিচ্ছুক পুলিশের এক ঊর্ধ্বতম কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র‌্যাব-পুলিশের এ ব্যস্ততাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে স্বর্ণ চোরা কারবারিরা।

এছাড়া মহাসড়কে সব গাড়ি আলাদাভাবে চেকিংয়ের সুযোগ নেই, তাই প্রাইভেট গাড়িকে স্বর্ণ চোরাচালানে ব্যবহার করা হচ্ছে। আরেকটি সূত্র জানায়, গুটি কয়েক ধরা পড়লেও অনেক বড় বড় চালান আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এক্ষেত্রে কাস্টমসের কর্মকর্তা, পুলিশ বিমানকর্মীসহ জড়িত থাকার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, আমদানির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় চোরাই পথেই আসছে স্বর্ণ। এতে একদিকে সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে চোরাই স্বর্ণ ঘিরে অপরাধী চক্রের বেপরোয়া দাপট বেড়েই চলছে। হুন্ডি ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা পাচারকারীরাও স্বর্ণের বার ব্যবহার করছে। অস্ত্র, মাদকসহ চোরাচালানি পণ্যের দাম হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে স্বর্ণের বিস্কুট।

 

"