মশায় অতিষ্ঠ নগরবাসী

* নিয়মিত ওষুধ দেওয়া হয় না * পরিষ্কার করা হয় না খাল

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

হাসান ইমন

রাজধানীর তেজগাঁও নাখালপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাহবুব আলম। ২০১৪ সাল থেকে এ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকছেন। এ পাঁচ বছরের মধ্যে তিনি পাঁচ দিনও দেখেননি মশার ওষুধ স্প্রে করতে। সর্বশেষ গত জানুয়ারি মাসের এক দিন বিকেলে মশার ওষুধ (ফগার) স্প্রে করতে দেখেছেন। এ ছাড়া গত দুই মাসের সকাল-বিকেল এ দুই সময়ের মধ্যে কোনো কর্মীকে মশার ওষুধ স্প্রে করতে দেখেননি। তাও যখন গণমাধ্যমে মশাকে নিয়ে খবর প্রকাশ হয়, তখন মশককর্মীদের এক দিন একটু দেখা যায়। তা না হলে তাদের খোঁজও পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেন এ বাসিন্দা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে ঢাকার মধ্যবাড্ডায় বসবাস করছেন শামসুল ইসলাম তুহিন। একজন চাকরিপ্রত্যাশী হওয়ায় তিনি সারা দিন মেসে থেকেই পড়ালেখা করেন। তিনি বলেন, বাধ্য হয়ে মশারি কিনেছি, এখন দিন-রাত সব সময়ই বাসায় মশারি টাঙানো থাকে আর এর মধ্যেই পড়ালেখা করি, মশার যন্ত্রণা থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় নেই।

রাজধানীর মুগদা এলাকার রঞ্জন সরকার মশায় অতিষ্ঠ হয়ে বলেন, সারা দিন কাজ সেরে বাসায় ফিরে মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ থাকতে হয়। মশারি টাঙ্গিয়ে তার ভেতরে ঢুকতে বা বের হতে হয়। বাসায় আছে ছোট বাচ্চাÑ তাই সব সময় কয়েল বা অ্যারোসলও ব্যবহার করা যায় না। তাই মশা নিয়ে খুব বিপদে আছি। সিটি করপোরেশন কী করে কিছুই বুঝি না। সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা-জানালা সব বন্ধ করে বদ্ধভাবে থাকতে হয়।

শুধু মাহবুব, তুহিন আর রঞ্জন সরকার নন, মশার এমন জ্বালা-যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রাজধানীতে বসবাস করা অধিকাংশ মানুষ। গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানীতে মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাসা-বাড়ি, অফিস, খেলার মাঠ সর্বত্রই মশা আর মশা।

মশা নিধনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজধানীবাসী। তারা বলছেন, প্রতিদিন সকাল-বিকেল দুবেলা মশা নিধনে বিষাক্ত কীটনাশক ছিটানোর কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। মশক নিধনকারী কর্মীদের দেখা পাওয়া যায় না।

অন্যদিকে দুই সিটি করপোরেশনের মশক নিধনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বলছেন, বাসাবাড়ির আঙিনা, ফুলের টব, ছাদের বাগান, ভবনের চৌবাচ্চা, এসি-ফ্রিজ থেকে জমা পানিতে মশার বংশ বিস্তার বেশি ঘটে। এসব স্থানে মশক নিধনকর্মীরা যেতে পারেন না। এ ছাড়া অন্যসব জায়গায় ওষুধ ছিটানোর ব্যাপারে শ্রমিকরা সঠিকভাবেই কাজ করছেন। আর ইদানীং মশার উপদ্রব ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, সে কারণে শিগগিরই মশা নিধনে আরো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এদিকে নগরবাসীর অভিযোগ, শীতকালে মশার দাপট কম থাকলেও গরম শুরু হওয়ায় উৎপাত বেড়েছে। জলাশয়গুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এমনকি ড্রেনে পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল জমে থাকায় পানি ঠিকমতো নামতে না পারায় দূষিত পানিতে মশার জন্ম হচ্ছে। যার প্রকৃত উদাহরণÑ গুলশান-বনানী লেক, রামপুরা খাল, মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খাল ও রূপনগর খাল। এসব খাল ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। এসব জলাধার পরিষ্কার না হওয়া মশার বংশ বিস্তার দ্রুত বাড়ছে।

দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, মশা নিধন কার্যক্রমের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) চলতি অর্থবছরে ২৬ কোটি টাকা বাজেট নির্ধারণ করা হয়। আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মশক নিধনে ২১ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আরো জানা যায়, ডিএসসিসিতে মশার ওষুধ ছিটানোর ৯৪০ মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে হস্তচালিত, ফগার ও হুইল ব্যারো মেশিন কিন্তু অর্ধেক মেশিনই প্রায় অচল রয়েছে। অন্যদিকে ডিএনসিসিতে হস্তচালিত, ফগার, হুইল ব্যারো, ভ্যাহিক্যাল মাউন্টেড ফগার মেশিন মিলিয়ে মশা নিধনের মেশিন রয়েছে ৬৫৩। এর মধ্যেও অর্ধেক নষ্ট। সব মিলিয়ে রাজধানীর মশা নিধনে অনেকটাই হিমশিম খাচ্ছে দুই সিটি করপোরেশন।

মশা নিধন সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হাসান বলেন, নগরীতে যারা মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে এমন বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে ডিএনসিসি আলোচনা করেছে। তা ছাড়া নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণে গত বছর ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বিশেষ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। নগরীতে মশা বাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, যত দ্রুত অপরিকল্পিত নগরায়ণ হবে, তত দ্রুতই কিন্তু বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম তৈরি হচ্ছে, ডোবা-নালা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া অনেকে স্থানে ড্রেনের ওপর বস্তি এবং দোকান গড়ে ওঠায় একদিকে মশার নিরাপদ বংশ বিস্তার ঘটছে। অন্যদিকে এই পতঙ্গটি নিয়ন্ত্রণে প্রতিবন্ধকতারও সৃষ্টি হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দফতরের মধ্যে সমন্বয়হীনতাকেও একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

শুধু মশার ওষুধ দিয়েই মশা নির্মূল সম্ভব নয়। এ জন্য যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা না ফেলতে নগরবাসীকে অনুরোধ জানানোর পাশাপাশি সিটি করপোরেশন কর্মকর্তারা ড্রেন, ঝিল ও ডোবা পরিষ্কার রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

 

"