কাল শুরু হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

নাঈমুল হাসান, টঙ্গী থেকে

গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগতীরে আগামীকাল শুক্রবার ভোরে শুরু হচ্ছে তাবলিগ জামাতের ৫৪তম বিশ্ব ইজতেমা। ফজরের নামাজের পর আমবয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি সোমবার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা। এরই মধ্যে দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ইজতেমা ময়দানে এসেছেন। দ্বন্দ্ব এড়াতে এবারের বিশ্ব ইজতেমা আরো একদিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে তিন দিনের পরিবর্তে চার দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ওয়াই এম বেলালুর রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, এবার বিশ্ব ইজতেমায় অন্যবারের চেয়ে বেশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশের প্রায় ১০ হাজার সদস্য মোতায়েন থাকবেন। ওয়াচ টাওয়ার ও সিসি ক্যামেরাও লাগানো হয়েছে বেশি।

ইজতেমার মুরুব্বি ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৫টি গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের অজু-গোসলের জন্য। প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হবে। এ ছাড়া মুসল্লিদের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক টয়লেট ও গোসলখানা স্থাপন করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ৩০টি ফগার মেশিনের মাধ্যমে মশা নিধনের ওষুধ ছিটানো হবে। বিদেশিদের ক্যাম্পে রান্নার জন্য ১৩৬টি গ্যাসের চুলা স্থাপন করা হবে। বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য ৩৫টি চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে।

বিশ্ব ইজতেমার প্রথম ধাপ শেষ হবে ১৬ ফেব্রুয়ারি। পর দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই মাঠে প্রবেশ করবেন দ্বিতীয় ধাপ পালনের জন্য। তবে ১৮ ফেব্রুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা।

দিল্লির মাওলানা সাদকে নিয়ে চলমান সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে মাওলানা ওয়াসিফুর জানান, তিনি এবারের ইজতেমায় যোগ দিতে বাংলাদেশে আসছেন না। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর বলেন, ইজতেমা এলাকাসহ আশপাশের এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, অশ্লীল পোস্টার অপসারণ ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় বিশুদ্ধ খাবার নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ইজতেমা ময়দানের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কারের জন্য সার্বক্ষণিক কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। ইজতেমা ময়দানে মুসল্লিদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় ২০১১ সাল থেকে দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

বিশ্ব ইজতেমায় রেলওয়ের বিশেষ ট্রেন ৩ দিন : গাজীপুরের টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে কাল শুক্রবার থেকে সোমবার পর্যন্ত বিভিন্ন গন্তব্যে কয়েকটি বিশেষ ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করেছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল বুধবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, (দুই পক্ষের) আখেরি মোনাজাতের আগে ও মোনাজাতের দিন বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করা হবে। ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি এ ট্রেন চলবে।

ঢাকা-টঙ্গী-ঢাকা : জুমা স্পেশাল (১৫ ফেব্রুয়ারি)। ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফা মোনাজাতে ‘মোনাজাত স্পেশাল ১, ২, ৩, ৪ নামে আলাদা চারটি স্পেশাল ট্রেন ঢাকা-টঙ্গীর মধ্যে চালানো হবে।

লাকসাম-টঙ্গী ও জামালপুর-টঙ্গী : রুটি (শুধু ১৭ ফেব্রুয়ারি)।

১৮ ফেব্রুয়ারি, দ্বিতীয় দফায় আখেরি মোনাজাতের দিন। ঢাকা-টঙ্গী আটটি। টঙ্গী-ঢাকা আটটি। টঙ্গী-লাকসাম একটি। টঙ্গী-আখাউড়া একটি। টঙ্গী-ময়মনসিংহ চারটি এবং টঙ্গী-টাঙ্গাইল দুটি ট্রেন চলাচল করবে।

এ ছাড়া দ্বিতীয় দফার আখেরি মোনাজাতের পূর্ব পর্যন্ত ঢাকা অভিমুখী সব আন্তনগর, মেইল এক্সপ্রেস ও লোকাল ট্রেন টঙ্গী স্টেশনে দুই মিনিট করে থামবে। ওইসব আন্তনগর ট্রেন ও মেইল এক্সপ্রেস ট্রেনগুলো (আপ ও ডাউন) টঙ্গী স্টেশন দুই মিনিট করে থামবে। ইজতেমা উপলক্ষে ১৬ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সব ডেমু ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে।

বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে মুসল্লিদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিতকরণ, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে টঙ্গী, বিমানবন্দর, তেজগাঁও ও কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে জিআরপি, আরএনবি অফিসারসহ প্রয়োজনীয়সংখ্যক ফোর্স মোতায়েন থাকবে।

 

ইজতেমায় উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়া যাবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ইজতেমায় বয়ানে বা সম্মুখে কেউ কারো বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে পারবেন না। ইজতেমা নিয়ে ফেসবুকে বা অন্য কোনো মাধ্যমে কোনো রূপ অপপ্রচার চালানো হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নেবে। গতকাল বুধবার দুপুরে বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে টঙ্গীতে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের টঙ্গী আঞ্চলিক কার্যালয় প্রাঙ্গণে ইজতেমার সর্বশেষ প্রস্তুতি নিয়ে ফলোআপ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী আগের চেয়ে অনেক দক্ষ। যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। ইজতেমার দুই পক্ষকে তাদের ৬ দফা ও ১০ দফা মেনে চলতে হবে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ইজতেমা সম্পন্ন করার জন্য উভয়পক্ষকে ধৈর্য ধরে সহনশীল আচরণ করতে হবে। এজন্য তিনি সবার সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।

গাজীপুর জেলা প্রশাসন আয়োজিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মো. আবদুল্লাহ, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহ বলেন, শান্তি ও শৃঙ্খলার সঙ্গে ইজতেমা সম্পন্ন করতে হবে। ইজতেমা আয়োজনের জন্য উভয়পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ইজতেমা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সরকার সব রকম সহযোগিতা করে যাচ্ছে। ইজতেমার মূল আয়োজন ইজতেমা কর্তৃপক্ষ করছে। সরকার কেবল তাদের নিরাপত্তাসহ সার্বিক দিকে সহযোগিতা করছে। ইজতেমায় কারা আসবেন আর কারা আসবেন না সেটা ইজতেমা কর্তৃপক্ষই সিদ্ধান্ত নেবেন। দুই পক্ষ তাদের যে তালিকা দেবেন সে তালিকা অনুসারে বিদেশি মুসল্লিদের ভিসা দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে ইজতেমা আয়োজনের সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। সবার সহযোগিতায় এবার সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ইজতেমা সম্পন্ন হবে। ইজতেমায় আগত সব মুসল্লিদের নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ ও সতর্ক রয়েছে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীরের সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য দেন পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. জাবেদ পাটোয়ারী, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ওয়াই এম বেলালুর রহমান, ঢাকা উত্তরা জোনের ডিসি (ট্রাফিক) প্রবীর কুমার রায়, গাজীপুরের পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার, ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন মেরামত) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ, ইজতেমার মুরব্বি মাওলানা জুবায়েরপন্থী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান, সাদপন্থী মাওলানা ওয়াসিফুল ইসলাম প্রমুখ।

সভায় জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর জানান, আগামীকাল বৃহস্পতিবারের মধ্যে ইজতেমা ময়দান শতভাগ প্রস্তুত হয়ে যাবে। মুসল্লিদের সেবাদানের জন্য সরকারের সব সংস্থা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

"