মধুদার ক্যান্টিনে অন্য রকম সকাল

* আন্দোলনের অলিখিত এই সদর দফতরে আবার মিলনমেলা * ছাত্রদলকে স্বাগত জানাল ছাত্রলীগ

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

মোস্তফা কামাল
ama ami

আন্দোলনের বীজ রোপণের কেন্দ্রভূমিতে দীর্ঘ ৯ বছর পর এক অন্য রকম সকাল দেখল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীরা। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন কেন্দ্র করে এ দিন এলো ছাত্রদল। তাদের স্বাগত জানালেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। শুরুতেই একে অপরের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন উভয় সংগঠনের নেতারা। পরে ছাত্র ইউনিয়নসহ বাম সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন ছাত্রদলের নেতারা। পরে ছাত্রলীগ-ছাত্রদল মুহুর্মুহু দলীয় সেøাগান দেয়।

এই মধুর ক্যান্টিন নেতৃত্ব তৈরির সূতিকাগার হিসেবেই পরিচিত। ’৪৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অলিখিত সদর দফতর মধুসূদন দে-মধুদার এই ক্যান্টিন।

জনশ্রুতি আছে, মধুর ক্যানটিন ছিল বাগানবাড়ির নাচঘর। তবে হাকিম হাবিবুর রহমানের মতে, এটি বাগানবাড়ির দরবার কক্ষ ছিল। এখানেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে নকরী চন্দ্রের ছেলে আদিত্য চন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ব্যবসা শুরু করেন। আদিত্য চন্দ্র ব্রিটিশ পুলিশের কাছ থেকে ৩০ টাকার বিনিময়ে দুটি শণের ঘর কেনেন। তার একটিতে দোকান পরিচালনা করেন। আদিত্য চন্দ্রের ছেলে মধুসূদন দে ১৯৩৪-৩৫ সাল থেকে বাবার সঙ্গে ব্যবসার হাল ধরেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তরিত হলো নীলক্ষেতের কলাভবনে। আর সেই সঙ্গে মধুর ক্যান্টিনও চলে এলো তার পাশেই ঢাকার নবাবদের দরবার হলে। আগে এটি মধুর স্টল, মধুর টি-স্টল, মধুর রেস্তোরাঁÑ বিভিন্ন নামে ছিল। কিন্তু অচিরেই এটি মধুর ক্যান্টিন নামে প্রতিষ্ঠিত হয়।

আন্দোলনের বীজ রোপণের কেন্দ্রভূমি ছিল মধুর ক্যান্টিন। সাহিত্যিক, নাট্যকর্মী, শিল্পী, শিক্ষার্থী, ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক কর্মী-সবারই ঠিকানা ছিল মধুর ক্যান্টিন। মধুসূদন দে সব প্রতিরোধ আন্দোলনে আন্দোলনকারীদের সহযোগী ছিলেন। তার মধুর ক্যান্টিন বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক আন্দোলনে কখনো সরাসরি, কখনো নেপথ্যে, কখনো সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। তাই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর রোষানলে পড়েন মধুসূদন দে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মধুদা, তার স্ত্রী, বড় ছেলে ও তার নববিবাহিত স্ত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেই ইতিহাসসমৃদ্ধ মধুর ক্যান্টিন আজও গতিময়।

এরই ধারবাহিকতায় গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে ঢাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকির নেতৃত্বে নেতকর্মীরা মধুর ক্যান্টিনে আসেন। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান।

ছাত্রদল সভাপতি রাজীব আহসান বলেন, আমরা ঢাবি প্রশাসনকে সাত দফা দাবি জানিয়েছি। প্রথমটি ছিল ক্যাম্পাসে এবং হলে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। আমরা ১০ বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি। প্রশাসন ও অন্য ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চাই। তার পদক্ষেপ হিসেবে আমরা এখানে এসেছি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি তিনি বলেন, সহাবস্থানের স্থায়ী সমাধানের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানাচ্ছি। প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে যেসব অগণতান্ত্রিক ধারা আছে তা বাতিল করতে হবে।

অপরদিকে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, ক্যাম্পাসে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আছে সেটা আজকে প্রমাণ হয়ে গেছে। যার যার রাজনীতি সে করবে।

এদিকে ডাকসু নির্বাচনের সর্বশেষ পরিস্থিতি ও তাদের অবস্থান জানাতে মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রদল। ডাকসু নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নির্মাণে নির্বাচন তিন মাস পিছিয়ে দেওয়া, হলের পরিবর্তে একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র করাসহ যে সাত দফা দাবিতে তারা উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিয়েছিল, সেগুলোই পুনর্ব্যক্ত করে সংগঠনটি। এছাড়া ডাকসু নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল বাতিল করে পুনঃতফসিল দাবি করে ছাত্রদল।

এর আগে সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে মধুর ক্যান্টিনে ঢোকেন ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক আবুল বাসার সিদ্দিকী, কেন্দ্রীয় সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রমুখ। ছাত্রদলের মধুর ক্যানটিনে যাওয়ার খবর পেয়ে আগে থেকেই মধুর ক্যানটিনে জড়ো হতে শুরু করেন ছাত্রলীগের বিভিন্ন হল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে সংগঠনের ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধুর ক্যানটিনে স্বাগত জানান।

মধুর ক্যানটিনে তখন ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী, সহ-সভাপতি তুহিন কান্তি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাশেদ শাহরিয়ার ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রগতি বর্মণ তমা। তাদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করেন ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দুই শীর্ষ নেতা। এরপর কয়েকটি টেবিল একসঙ্গে করে নেতাকর্মীদের নিয়ে বসেন। পরে বেলা ১১টা ২০ মিনিটে আসেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান। আর দুপুর ১২টার দিকে আসেন কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজিব আহসান।

ছাত্রদলের ঢাবি শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার বলেন, মধুর ক্যান্টিন আমাদের আবেগের জায়গা। অনেক দিন পর এখানে এলাম। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে কিছুটা সহযোগিতার মনোভাব আমরা পেয়েছি। এখন থেকে আমরা নিয়মিত ক্যাম্পাসে ও মধুর ক্যান্টিনে আসব।

"