সংঘর্ষ : গুলিতে নিহত

বাড়ি থেকে গরু নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ : বিজিবির অস্বীকার

আত্মরক্ষায় গুলি ছোড়ার দাবি

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

শাকিল আহমেদ, ঠাকুরগাঁও
ama ami

গ্রামে মানুষের বাড়িতে গিয়ে হানা দেন বেতনা ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা; এরপর বাড়ি থেকেই জোর করে গরু নিয়ে যান ক্যাম্পে। তাদের কাগজপত্র দেখালেও গরুগুলো ফেরৎ পাওয়া যায় না। শুধু বাড়িতে হানা দিয়েই শেষ নয়, রাস্তা থেকেও গরু তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে বিজিবি সদস্যদের বিরুদ্ধে। মাসখানেক ধরে বেতনা ক্যাম্পের বিজিবির সদস্যদের কাছে এমন হয়রানির শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন হরিপুর উপজেলার বকুয়া ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বহরমপুর গ্রামের মানুষ। গরু জব্দ করার জেরে গত মঙ্গলবার বিজিবির সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষে তিনজন নিহতের পর গতকাল বুধবার বহরমপুর গ্রামে সাংবাদিকরা গেলে অনেকেই এমন অভিযোগ করেন। তবে গ্রামবাসীর অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিজিবি। বিজিবি কর্মকর্তাদের দাবি, চোরাকারবারিরা পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর হামলা চালায়। এ কারণে আত্মরক্ষায় তারা গুলি ছুড়তে বাধ্য হন। এদিকে গতকাল দুপুরে নিহতদের লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। পরে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সকালে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে লাশ দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা করে দিয়েছেন জেলা প্রশাসক কে এম কামরুজ্জামান সেলিম। ঘটনা তদন্তে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

হরিপুর থানার ওসি আমিরুজ্জামান আমির বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যা ৬টার দিকে নিহতদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে জলায় নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যার ঘটনায় বিজিবির কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী। গতকাল বিকেলে উপজেলার বকুয়া ইউনিয়নের চাঁপধা বাজারে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে এলাকাবাসী। মানববন্ধনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী, বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণির পেশার মানুষ অংশ নেন।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন, বকুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু তাহের, সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম, শিক্ষক সোহেল রানা, স্থানীয় আবদুল বারেক, হরিপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মিলন প্রমুখ।

এলাকাবাসী জানায়, একটি গরু বিক্রির জন্য সকালে বাজারে নিচ্ছিলেন হরিপুরের বহরমপুরের মাহাবুব আলী। পথে বেতনা ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা গরুটি ভারতীয় মনে করে জব্দ করে ক্যাম্পে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাতে বাধা দেন মাহাবুবের পরিবার ও এলাকাবাসী। এক পর্যায়ে বিজিবি সদস্যদের ঘেরাও করে হামলা চালায় এলাকাবাসী। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি ছোড়ে বিজিবি। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান বহরমপুর গ্রামের এক শিক্ষার্থী জয়নুল, প্রাইভেট শিক্ষক নবাব ও পথচারী সাদেক মিয়া।

বিজিবি কর্মকর্তাদের দাবি, চোরাকারবারিরা পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর হামলা চালায়। এ কারণে আত্মরক্ষায় তারা গুলি ছুড়তে বাধ্য হন।

বহরমপুর গ্রামে সাংবাদিককরা গেলে অনেকেই অভিযোগ করেন, বিজিবি সদস্যরা অবৈধ বলে গৃহস্থের গরুও নিয়ে যায়। টাকা দিয়ে সেই গরু ফেরত আনতে হয়, অনেক সময় টাকা দিয়েও পাওয়া যায় না।

গ্রামের আবদুল লতিফ বলেন, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও বেতনা ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা কৃষকের গরু নিয়ে যাচ্ছেন। কাগজপত্র দেখালেও গরু ফেরত দেন না তারা। দেড় মাস ধরে ৩০ থেকে ৪০টি গরু বিজিবি সদস্যরা নিয়ে গেছেন। এখন বিজিবির ভয়ে কেউ গরু পালন করতে পারেন না।

গ্রামের আরেক বাসিন্দা সলেমান আলী বলেন, একমাস ধরে বিজিবি সদস্যরা প্রত্যেক বাড়িতে দিনে-রাতে হানা দিয়ে কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও গরু তুলে নিয়ে যান। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা কাগজপত্র নিয়ে ক্যাম্পে গেলে টাকা নিয়ে গরু ফেরত দেয়; আবার কয়েকটি গরু ফেরত দেওয়া হয়নি।

একই গ্রামের জয়গুন বেগম বলেন, বিজিবি সদস্যরা আমাদের দুটি হালের গরু ধরে নিয়ে গেছে। কাগজপত্র দেখানো হয়েছে এবং বিজিবি সদস্যরা কাগজপত্রগুলো ছিঁড়ে ফেলে দেন এবং গরুগুলো অবৈধ বলে দাবি করেন। অনেক ঘুরেছি তারপরও গরু ফেরত দেয়নি। বকুয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য আবদুল মজিদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে থেকে বিজিবি সদস্যরা মানুষের ওপর জুলুম করছেন। যারা সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে গরু নিয়ে আসে বিজিবি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তুহিন মো. মাসুদ বলেন, বিজিবি সদস্যরা কাউকে হয়রানি করে না। আমাদের সদস্যরা দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সীমান্ত এলাকায় কাজ করেন। ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক কে এম কামরুজ্জামান সেলিম বলেন, কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি নিরীহ মানুষকে হয়রানি করে তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

"