হজযাত্রায় খরচ এবারও বাড়ল

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক
ama ami

সরকারি-বেসরকারি দুই ধরনের হজযাত্রায় এবারও খরচ বেড়েছে। এ নিয়ে টানা দুই বছর হজে যাওয়ার খরচ বাড়ল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল সোমবার তার কার্যালয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতি-২০১৯’ এবং ‘হজ প্যাকেজ-২০১৯’ এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। এদিকে, প্রয়াত সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের নামে গড়ে তোলা ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘরকে’ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাব এনেছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। জাদুঘরটির অবস্থান চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানার কাজির দেউড়ি এলাকায়। চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে নওফেলের এই প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছেন মন্ত্রিসভার প্রায় সব সদস্য। প্রস্তাবে নীতিগত সমর্থন এসেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকেও।

সভা শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের জানান, সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যেতে প্যাকেজ-১-এ এবার চার লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং এবং প্যাকেজ-২-এ তিন লাখ ৪৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর প্যাকেজ-১-এ তিন লাখ ৯৭ হাজার ৯২৯ টাকা এবং প্যাকেজ-২-এ তিন লাখ ১৯ হাজার ৩৫৫ টাকা নির্ধারিত ছিল। সেই হিসাবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্যাকেজ-১-এ এবার ২০ হাজার ৫৭১ টাকা এবং প্যাকেজ-২-এ ২৪ হাজার ৬৪৫ টাকা বেশি খরচ পড়বে।

২০১৭ সালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্যাকেজ-১-এর তিন লাখ ৬০ হাজার ২৮ টাকা এবং প্যাকেজ-২-এ তিন লাখ ৪ হাজার ৯০৩ টাকা নির্ধারিত ছিল। এবার বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় তিন লাখ ৪৪ হাজার টাকার কম নেওয়া যাবে না।

এ বছর কোরবানির খরচ ৪৭৫ রিয়াল থেকে বাড়িয়ে ৫২৫ রিয়াল করা হয়েছে জানিয়ে শফিউল বলেন, বেসরকারিভাবে বিমান ভাড়া এক লাখ ২৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে; যা গতবারের থেকে ১০ হাজার ১৯১ টাকা কম।

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ১০ আগস্ট হজ হতে পারে। এবার বাংলাদেশ থেকে এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজে যেতে পারবেন। এ বছর যারা হজে যেতে চান তাদের পাসপোর্টের মেয়াদ ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকতে হবে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

শফিউল বলেন, আর্থিক ও শারীরিকভাবে সমর্থ ব্যক্তিদের পাশাপাশি মানসিকভাবে সুস্থ ব্যক্তিরা হজে যেতে পারবেন। আগে মানসিকভাবে সমর্থন না থাকলেও হজে যাওয়ার সুযোগ ছিল। এবার রমজান মাসের আগেই সৌদিতে বাড়ি ভাড়া করতে হবে। সৌদির বাড়ি ভাড়া এবং সার্ভিস ও ক্যাটারিং চার্জ অনলাইনে জমা দিতে হবে, বলেন সচিব।

হজযাত্রীরা সৌদি আরবে যে বাড়িতে থাকবেন এবার থেকে ওই বাড়ির ঠিকানা পাসপোর্টের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হবে বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

এদিকে, প্রয়াত সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের নামে গড়ে তোলা ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘরকে’ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়কমন্ত্রী বীর বাহার উশৈসিং এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমেদ।

বৈঠকে উপমন্ত্রী নওফেল বলেন, যে ভবনটিকে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর বানানো হয়েছে, সেটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত একটি ভবন এটি। একসময় সার্কিট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখানে মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ১৯৭১ সালে অনেক নিরীহ বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাদের পাকিস্তানি সেনারা ধরে নিয়ে ওই ভবনে রেখে নির্যাতন করেছিল। সেখানে একটি ইলেকট্রিক চেয়ার ছিল। সেখানে বসিয়ে অকথ্য নির্যাতন করা হতো। অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে সেখানে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, চট্টগ্রামে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলিত হয়েছে।

তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তখন এই সার্কিট হাউসে এসে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৯১ সালে তার স্ত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর সেটিকে আকস্মিকভাবে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে রূপান্তর করেন, যা চট্টগ্রামবাসী এবং আপামর মুক্তিযোদ্ধারা মেনে নেননি। সেখানে জিয়াউর রহমানের কোনো স্মৃতি নেই। শুধু ১৯৭১ সালে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাটি জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে যে ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রচার হয়েছিল, সেটি এনে সেখানে রাখা হয়েছে। অথচ জিয়াউর রহমানের আগে একই ট্রান্সমিটার ব্যবহার করে এই ঘোষণা দিয়েছেন প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান। তাহলে শুধু জিয়াউর রহমানের নামে কেন জাদুঘর হবে?

নওফেল আরো বলেন, জিয়াউর রহমান একজন অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী। আদালতের রায়ে তিনি একজন অবৈধ সামরিক শাসক। তার নামে কেন একটি রাষ্ট্রীয় স্থাপনা এভাবে ব্যবহার করা হবে? তা ছাড়া জিয়ার নামে স্থাপনা হওয়ায়, এই দর্শনীয় স্থানটিতে চট্টগ্রামের মানুষ যান না। অথচ এটিকে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর করে একটি সার্বজনীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্ত করলে এটি দেশের সম্পদে পরিণত হবে।

মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে একটি প্রকল্প গ্রহণের অনুরোধ করেন মন্ত্রিসভার তরুণ সদস্য নওফেল। নওফেলের বক্তব্যের পর মুক্তিযোদ্ধাবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রথম তাকে সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি এই বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় থেকেও উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

মুক্তিযোদ্ধাবিষয়কমন্ত্রীকে সমর্থন জানিয়ে পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক বলেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জিয়া স্মৃতি জাদুঘরকে মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের প্রস্তাবে সমর্থন ব্যক্ত করছি।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯১৩ সালে চট্টগ্রাম নগরীর কাজির দেউড়ি এলাকায় তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা দৃষ্টিনন্দন ভবনটি নির্মাণ করে, যা পরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস হিসেবে রাষ্ট্রীয় অতিথিদের জন্য ব্যবহৃত হতো। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সফরে এসে সার্কিট হাউসের চার নম্বর কক্ষে উঠেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ভোরের দিকে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। ওই বছরের ৩ জুন সার্কিট হাউসকে একটি জাদুঘরে রূপান্তরের জন্য সরকারি প্রস্তাব গৃহীত হয়। এরপর ১৯৯১ সালে জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। ১৯৯৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সেই জাদুঘরের উদ্বোধন করা হয়। জাদুঘরে জিয়াউর রহমানের হত্যাকা-ের নমুনা, ব্যক্তিগত সামগ্রী এবং স্বাধীনতা ঘোষণার ট্রান্সমিটারটি সংরক্ষিত আছে।

"