সাগর-রুনি হত্যা

সাত বছরে শুধুই ‘অগ্রগতির গল্প’

আশা ছেড়ে দিয়েছেন সাগরের মা, ৫ দফায় তদন্ত কর্মকর্তা বদল

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী
ama ami

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির নৃশংস হত্যাকান্ডের রহস্য আলোয় আসছেই না। তদন্তের অগ্রগতি একেবারে শূন্যের কোঠায়। ঘটনার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেফতার করা হবে’ আলটিমেটাম দিয়েছিলেন। আর দুদিন পর তখনকার আইজিপি বলেছিলেন, তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এরপর থেকে কয়েক বছর ধরে তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাবও একই ‘অগ্রগতি’র গল্প শুনিয়ে আসছে। তবে এই অগ্রগতির শেষ কোথায়, বিচার কবে মিলবে, নিহত দম্পতির স্বজনদের পাশাপাশি সহকর্মীদের অপেক্ষার শেষ কবে হবে- এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই কারো কাছেই। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকান্ডটি যেন এক রহস্যবৃত্তে বন্দি! এদিকে তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকলেও ৬১টি অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দিয়েছে তদন্ত সংস্থা র‌্যাব। দফায় দফায় সময় নেওয়া হয়েছে। কিন্তু রহস্য উদ্্ঘাটন করতে পারেনি। এরই মধ্যে ৫ দফায় বদল করা হয়েছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। তারা এখন সাগর-রুনির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও করেন না। এমন প্রেক্ষাপটে বহুল আলোচিত এই সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকা-ের ৭ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ সোমবার। এ দিন সাগর-রুনির সহকর্মীরা প্রতিবারের মতো এবারও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছে। এই নিষ্ঠুর হত্যাকা-ের বিচার দাবিতে আজ বেলা ১১টায় ঢাকার রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। সমাবেশে নিহতের পরিবারের সদস্য, বিভিন্ন সংগঠন ও সাংবাদিকরা অংশ নেবেন।

অন্যদিকে, সাগর-রুনি দম্পতির একমাত্র ছেলে মাহীর সরওয়ার মেঘের সাত বছর কেটেছে বাবা-মা ছাড়া। এখন সে বুঝতে শিখেছে। প্রতি বছর ১১ ফেব্রুয়ারি এলেই গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতি বছর এটি যেন রুটিনকাজ। তবে এখন আর গণমাধ্যমের সামনে আসতে তার মন চায় না। দৌড়ে পালাতে ইচ্ছে করে। কী হবে কথা বলে? ফিরে আসবে কি তার বাবা-মা? সাতটি বছরে যেখানে জানাই গেল না কারা হত্যা করেছে মেঘের বাবা-মাকে। তাই শোকের দিনে আর শোক বাড়াতে চায় না অভিমানী মেঘ।

বাবা-মাকে হারানো মাহির সরওয়ার মেঘ ঢাকার বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়াল স্কুলের স্ট্যান্ডার্ড সিক্সে পড়ছে। ইদানীং ক্রিকেটের প্রতি বেশ ঝোঁক মেঘের। ইন্দিরা রোডসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে প্রতিদিন ক্রিকেট প্র্যাকটিস করতে যায় মেঘ। বাবা সাগর সরওয়ার আর মা মেহেরুন রুনির অভাববোধ হয়তো সব সময়ই থাকবে, তবে এর মধ্যেই জীবনের নিয়মে নানা ব্যস্ততায় নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে সে। মেঘ বাবা-মায়ের হত্যাকা- নিয়ে কিছুটা বুঝতেও শুরু করেছে। ঘটনার পর থেকে মামার কাছেই থাকে মেঘ। বাবা-মায়ের আশ্রয় যেন এ মামাই।

মেঘের মামা নওশের রোমান বলেন, ‘আমরা আসলে সাত বছর ধরে মামলা নিয়ে কিছুই জানতে পারিনি। আগে মিডিয়ার মাধ্যমে কিছুটা হলেও জানতে পারতাম। এখন সেখানেও তারা কথা বলছে না। এসব দেখে মনে হয়, এখন আর এ মামলার কোনো তদন্তই চলছে না।’

জানা গেছে, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তকাজ প্রথমে থানা পুলিশ শুরু করলেও একপর্যায়ে তা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে র‌্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে তদন্তের গতি থেমে আছে আগের জায়গাতেই। যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো আলামত পরীক্ষা করে ঘটনাস্থলে দুজন অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ পাওয়া গিয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত তাদের শনাক্ত করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। এদিকে দীর্ঘদিনেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় নিহতের পরিবার ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। আর তাই বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন গোলাম মোস্তফা সরওয়ার ওরফে সাগর সরওয়ারের মা।

সাগরের মা সালেহা মনির বলেন, দীর্ঘদিনেও কোনো তদন্ত সংস্থা এ হত্যাকা-ের রহস্য উদ্্ঘাটন করে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দিতে পারেনি। এ হত্যার বিচার হবেÑ এমন আশা আর করি না। এ বিষয়ে কিছু জানতে চাওয়ার অর্থ হলো শুধু শুধু মনের আগুন আবার জ্বালানো। তিনি বলেন, সরকার একটু সহানুভূতি দেখালে রহস্য বেরিয়ে আসত।

তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েছি, যতই মহড়া দেওয়া হোক না কেন, গ্রিল কেটে এত ছোট জায়গা দিয়ে চোর ঢুকবে তা বিশ্বাস করি না। এটা সুপরিকল্পিত হত্যাকা-। ছোটখাটো ছিঁচকে চোরকে আসামি করে চার্জশিট দেওয়া হলে তা মানব না।

তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা র‌্যাব সদর দফতরের সহকারী পরিচালক ও সহকারী পুলিশ সুপার শহিদা রহমান জানান, তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ডিএনএ রিপোর্ট অনুসারে দুই অজ্ঞাত পুরুষ আসামির সন্ধান করা হচ্ছে।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক গোলাম মোস্তফা সরওয়ার ওরফে সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন নাহার রুনা ওরফে মেহেরুন রুনি দম্পতি খুন হন। ঘটনার পরের দিন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের কথা থাকলেও ৬২ বার সময় নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ৯ জানুয়ারি এ মামলার প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু ওই দিনও র‌্যাব তা দাখিল করেনি। এ জন্য আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী দিন ঠিক করে দেন আদালত।

দফায় দফায় তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন : এ মামলার তদন্তকাজ প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানার এসআই জহুরুল ইসলাম শুরু করেন। ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ডিবির পরিদর্শক রবিউল আলম তদন্তভার নেন। এরপর হাইকোর্ট বিভাগের এক রিট পিটিশনে ১৮ এপ্রিল তদন্তভার র‌্যাবের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৯ এপ্রিল র‌্যাব সদর দফতরের এএসপি জাফর উল্লাহ মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন। র‌্যাবের এ কর্মকর্তা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ায় ২০১৪ সালের ১২ মার্চ এ মামলার তদন্তভার পান র‌্যাব সদর দফতরের এএসপি ওয়ারেছ আলী মিয়া। নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি এ কর্মকর্তা মামলার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাগর-রুনির ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে আসামি ও সন্দেহভাজনদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি র‌্যাব সদর দফতরের সহকারী পরিচালক এএসপি মহিউদ্দিন আহমদকে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়। এরপর গত বছরের ২৫ নভেম্বর এএসপি শহিদা রহমানকে তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি আগের সাক্ষীদের পর্যালোচনা করে তদন্ত অব্যাহত রেখেছেন।

আসামিদের বর্তমান অবস্থান : এ পর্যন্ত আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরা হলো রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মো. সাইদ, মিন্টু, কামরুল হাসান অরুণ ও নিহত দম্পতির বন্ধু তানভীর রহমান। এদের কেউই দায় স্বীকার করেনি। তবে তাদের মধ্যে সাগর-রুনির বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরী এনামুল হক ও পলাশ রুদ্র পাল ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ১৬১ ধারায় জবানবন্দি দেন। বর্তমানে রুদ্র পাল ও তানভীর জামিনে এবং বাকিরা কারাগারে আছে। এ পর্যন্ত ১৫৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র‌্যাব। এর মধ্যে ২৭ জন সাংবাদিকও রয়েছেন।

"