অর্থনীতির পালে হাওয়া : কমেছে বাণিজ্য ঘাটতি

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

শাহ্জাহান সাজু
ama ami

বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। আমদানির গতি কমায় এবং রফতানির গতি বাড়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে স্বস্তি ফিরেছে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) লেনদেন ভারসাম্যের চলতি হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০৮ কোটি ২০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতি ছিল প্রায় ৫০৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এ হিসাবে গত ছয় মাসে লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি কমেছে প্রায় ১৯৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক লেনদেন ভারসাম্যের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। জানা যায়, প্রায় ৯৭৮ কোটি (৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন) ডলারের রেকর্ড ঘাটতি নিয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষ হয়েছিল। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৩৩ কোটি ১০ লাখ (১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন) ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। সেই হিসাবে উন্নয়নশীল দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা ভালো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে পণ্য বাণিজ্যে বাংলাদেশের সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৬৬ কোটি (৭ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন) ডলার। গত বছরের একই সময়ে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৮৬২ কোটি ৮০ লাখ (৮ দশমিক ৬২ বিলিয়ন) ডলার। আর পুরো অর্থবছরে (জুলাই-জুন) অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে বাণিজ্য ঘাটতি ১ হাজার ৮২৫ কোটি ৮০ লাখ (১৮ দশমিক ২৬) ডলারে গিয়ে উঠেছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ২ হাজার ৭৮২ কোটি ৩০ লাখ (২৭ দশমিক ৮২ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। একই সময়ে রফতানি থেকে আয় হয়েছে ২ হাজার ১৬ কোটি ৩০ লাখ (২০ দশমিক ১৬ বিলিয়ন) ডলার। এ হিসাবে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৬৬ কোটি ডলার। সেবা বাণিজ্যে ঘাটতি কমে প্রায় ১৬০ কোটি ৬০ লাখ ডলার হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ২৩৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার ছিল। তবে বিদেশি বিনিয়োগ ও বিদেশি সহায়তা ছাড়ের পরিমাণ বাড়ায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারের আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ৪৮৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার, এবার একই সময়ে সেই উদ্বৃত্ত রয়েছে ২৬০ কোটি ৮০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর ১৩৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাংলাদেশে এসেছিল। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এসেছে ১৫৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। এ হিসাবে এই ছয় মাসে এফডিআই বেড়েছে প্রায় ১০ দশমিক ৬১ শতাংশ। উল্লিখিত সময়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বাবদ দেশে এসেছে ২৭৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে আমদানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছিল ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে রফতানি আয় বেড়েছে ১৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে বেড়েছিল ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ।

এদিকে, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ২৪০ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ২ হাজার ৪১৮ কোটি ডলার। রফতানি আয় বেড়েছে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ২ হাজার ১৩২ কোটি ৪৯ লাখ ডলার। এ ছাড়া জানুয়ারি মাসে ৩৬২ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রফতানি আয় হয়েছে ৩৬৮ কোটি ডলার। সেই হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় গত মাসে রফতানি আয় ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেশি হয়েছে। গত অর্থবছরের জানুয়ারিতে রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৩৪০ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। প্রধান রফতানি পণ্য পোশাক খাতের আয় ধারাবাহিকভাবে ভালো হওয়ায় রফতানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

ইপিবির হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোশাক খাতের নিট পণ্য (সোয়েটার, টি-শার্ট জাতীয় পোশাক) রফতানি আয় ও প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় দুটোই বেড়েছে। ৯২৭ কোটি ৮৮ লাখ ডলারের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৪ কোটি ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে এ খাতে রফতানি ছিল ৮৯০ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। আলোচ্য সময়ে ওভেন পণ্যেও (শার্ট, প্যান্ট জাতীয় পোশাক) রফতানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ১৮ শতাংশ। ৯৫০ কোটি ২২ লাখ ডলারের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ওভেন পণ্য রফতানি হয়েছে ১ হাজার ৭ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৮৭৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। জুলাই-জানুয়ারি সময়ে বড় পণ্যের মধ্যে প্লাস্টিক পণ্যের রফতানি আয় বেড়েছে। এ খাতে রফতানি আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যার প্রবৃদ্ধি ১৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। মাছ রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে উল্লেখ করার মতো। এ সময়ে ৩৬ কোটি ১০ লাখ ডলারের মাছ রফতানি হয়েছে। এর প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। তবে চামড়া ও চামড়জাত এবং পাট ও পাটপণ্যের রফতানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। এ ছাড়া কৃষিজাত পণ্যের রফতানি আয় বেড়েছে। এ সময়ে ৫৭ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের কৃষিজাত পণ্য রফতানি হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ৬১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। পাশাপাশি আসবাবপত্র, হস্তশিল্প, বিশেষায়িত টেক্সটাইল পণ্য, রাসায়নিক পণ্য ও পাদুকার রফতানি বেড়েছে।

"