এরশাদকে থামিয়ে দিয়েছে বয়স

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

বদরুল আলম মজুমদার

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মহম্মদ এরশাদ। কয়েক মাস আগেও দাপিয়ে বেড়িয়েছেন রাজনৈতিক অঙ্গন। মিটিং-আলোচনা সভায় অংশ নিতে চষে বেড়াতেন দেশের বিভিন্ন এলাকা। রাজনীতির মাঠ আর সভা সমাবেশে কথা বলতেন নিজস্ব স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে। এমনকি হুঙ্কার ছাড়তেন নিজ দলের নেতাকর্মীদের। যাকে নিয়ে বিভিন্ন সময় মুখরোচক আলোচনা হতো চায়ের টেবিলে, সেই এরশাদ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও এখন অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন। অন্যের সহযোগিতা ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না। বয়সের ভারে নেতিয়ে গেছেন সাবেক এই স্বৈরসাশক। দেশের রাজনীতিতে আলোচিত-সমালোচিত রাজনীতিক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। গত সোমবার রাত ১০টা সিঙ্গাপুর থেকে নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ শেষে দেশে ফিরেছেন তিনি।

শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ দেখালেও হাঁটার জোর নেই পায়ে। চলাফেরা করতে হয় অন্যের সহযোগিতা নিয়ে। বয়স প্রায় ৯০ এর কোটায়। শরীর অনেকটাই দুর্বল।

দেশে ফেরার পরের দিন মঙ্গলবার এরশাদের দ্বিতীয় বাসস্থান খ্যাত বনানীর চেয়ারম্যান কার্যালয় সুগন্ধায় যান তিনি। পূর্ব ঘোষণা না দিয়ে সকাল সোয়া ৯টায় চলে যান অফিসে। তার হঠাৎ আগমনে সবাই চমকে উঠেন। ওইদিন ছিল সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকারের শেষ দিন। এ সময় গাড়ি থেকে নামার পর পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার ওপর ভর করেই নিজের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। তখন পার্টির শীর্ষ নেতাদের কেউই উপস্থিত না থাকলেও সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের মধ্যে অধ্যাপক মাসুদা এম রশিদ চৌধুরী এইচ এম এরশাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

এর কিছু সময় পর আসেন কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের। চেয়ারম্যানের আগমনে পার্টির শীর্ষ নেতারা ভিড় জমাতে থাকেন চেয়ারম্যান অফিসে। দ্বিতীয় তলায় উঠতে কষ্ট হবে বিধায় নির্ধারিত কক্ষে না গিয়ে নিচতলায় পার্টির মহাসচিবের কার্যালয়ে বসেন এরশাদ। ৪০ মিনিটের মতো অবস্থান করে ১০টা ৫৫ মিনিটে নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শেষে প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসভবনে ফিরে যান এরশাদ।

সেনাপ্রধান হয়ে ১৯৮২ সালে এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। দীর্ঘ ৯ বছর ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। এরপর তীব্র গণঅভুত্থানের মুখে গদি ছাড়তে হয় তাকে। টানা ৩৭ বছরের ইতিহাসে এরশাদের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভালো-মন্দ নানা দিক।

কবি ও প্রেমিক হিসেবে খ্যাত প্রবীণ এই রাজনীতিক নিজ মুখেই বলেছেন, সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতা নেওয়ার পর রাজনীতিতে টিকে থাকার ইতিহাসে বিরল ব্যক্তিত্ব তিনি। তবে ক্ষমতাচ্যুতির পর স্বাধীনভাবে খুব একটা রাজনীতি চর্চা হয়নি তার। বড় দুই দলের কাছে কার্যত বন্দি এরশাদ। তাকে নিয়ে রয়েছে নানা মুখরোচক সমালোচনা। বার বার মত পাল্টানো নেতা হিসেবেও এরশাদের জুড়ি মেলা ভার। কোনো সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারেননি তিনি রাজনীতির পড়ন্ত বিকেলেও।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতারা বলছেন, ক্ষমতায় থাকতে নিজের কর্মকান্ডের জন্য এরশাদ অনেক বেশি সমালোচিত। জাতীয় পার্টির প্রচার ও প্রকাশনা সেল থেকে প্রকাশিত গ্রন্থে এরশাদ বলেন, এক বিপর্যস্ত বাংলাদেশের দায়িত্ব আমাকে গ্রহণ করতে হয়েছিল। তারপর অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ৯টি বছর কেটে গেছে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার। সেখানে কতটুকু সফল হয়েছি বা বিফল হয়েছিÑ তার মূল্যায়ন করতে হলে পরবর্তী সময়ের সঙ্গে আমার আমলের যোগ-বিয়োগ করার প্রয়োজন হবে। আমার মনে হয়, দেশের মানুষ সে অঙ্কটি নির্ভুলভাবে করতে পেরেছে। এরশাদ বলেন, আমি ’৯০-এর ডিসেম্বরে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং একজন প্রধান বিচারপতিকে বিশ্বাস করে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়েছিলাম। তারপর উভয়পক্ষের রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার ফলশ্রুতিতে আমাকে জেলে যেতে হয়েছে। অতপর জনতার আদালতে আমি সুবিচার পেলেও ক্ষমতার আদালত আমাকে মুক্তি দেননি।

১৯৩০ সালের দুই জানুয়ারি রংপুর জেলার দিনহাটায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়ে পাকিস্তানে চলে যান। ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের সঙ্গে তিনি দেশে ফেরেন। তারপর আবারও যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। ১৯৮৫ সালে প্রথম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন করেন তিনি। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই দলের মনোনয়ন নিয়ে পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাকে কারাগারে যেতে হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি জামিনের মধ্য দিয়ে তার কারামুক্তি হয়। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে তিনি কারাগার থেকে নির্বাচন করে পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। ২০০০ সালে তার দল জাতীয় পার্টি ভেঙে তিন টুকরো হয়।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে এক পর্যায়ে ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর গুলিতে নিহত হন ডা. শামসুল আলম মিলন। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই এরশাদের পতনের যাত্রা আরো তেজি হয়। ১৯৮৭ সালের ১০ নবেম্বর বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ সেøাগান ধারণ করে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন নূর হোসেন। মিছিলটি গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে পৌঁছানোর পর এর পুরোভাগে থাকা নূর হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। তার মৃত্যুতে বেগবান হয় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।

সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী ও এরশাদের সামরিক শাসনকে অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থি ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে এ রায় দেন। সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলের সব কর্মকান্ডকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নব্বইয়ের শেষে জেনারেল এরশাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই যেসব জায়গায় জাতীয় পার্টি শক্ত অবস্থানে ছিল সেসব জায়গা ১৯৯৬ সালের পর থেকে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

"