প্রেম আছে সন্দেহে ২ বছর অন্ধকার ঘরে বন্দি

ইউএনওর হস্তক্ষেপে প্রাণ বাঁচল ছাত্রীর

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

জাকিরুল জাকির, বিরামপুর (দিনাজপুর)
ama ami

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার বিনোদনগর ইউনিয়নের রাঘবিন্দুপুর গ্রামের মৌলভী রোস্তম আলীর মেয়ে সুমি খাতুনকে শত্রু পরিবারের ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক আছে সন্দেহে অন্ধকার ঘরে দুই বছর আটকে রেখেছিল তার মা। মেয়েটি উচ্চমাধ্যমিক পাস। শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) হস্তক্ষেপে জীবন রক্ষা পেয়েছে এই ছাত্রী। নির্বাহী কর্মকর্তা ও ছাত্রীর প্রতিবেশীরা বলেছেন মেয়েটির প্রতি মা-বাবার এই আচরণ অসভ্য যুগের ঘটনাকেও হার মানিয়েছে। ছাত্রিটির বাবা মৌলভী রোস্তম আলী বলেছেন তিনি এজন্য দায়ী নন, সুমিকে এভাবে আটক রাখেন তার মা।

নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) হস্তক্ষেপে মেয়েটিকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ছাত্রীটির মা বলছেন, কবিরাজ ও স্বপ্নে দেখা এক ব্যক্তির পরামর্শে মেয়েকে এভাবে ঘরে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন তারা।

স্থানীয়রা জানান, ওই পরিবারের সঙ্গে বিরোধ আছে এমন এক পরিবারের ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সন্দেহে ওই ছাত্রীকে তার পরিবার আটকে রেখেছিল। বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকলেও যে ঘরে মেয়েটিকে আটকে রাখা হয়, সেই ঘরে কোনো বিদ্যুৎ ছিল না। এমনকি ঘরের দরজা-জানালা সব সময় তালা মেরে রাখা হতো।

ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আশরাফুল ইসলাম বলেন, ওই ছাত্রীর চাচা দুই বছর আগে ছাত্রীকে আটক রাখার বিষয়টি আমাকে জানান তখন তিনি ওই ছাত্রীর বাড়িতে গেলে তার সঙ্গে কেউ কথা বলেননি। তিনি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন।

গতকাল শুক্রবার ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, ছাত্রীটির মুখ ও পা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। বন্দিদশায় তার হাত-পায়ের আঙুলগুলো গেছে কুঁকড়ে। জীর্ণ-শীর্ণ শরীর, রক্তশূন্যতাসহ নানা সমস্যায় আক্রান্ত মেয়েটি কিছুতেই বসে থাকতে বা দাঁড়াতে পারছে না। কথা বলতে গেলে শরীর কাঁপুনি দিচ্ছে। দুর্গন্ধ বের হচ্ছে তার শরীর থেকে।

নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন অপচিকিৎসায় ও বদ্ধ ঘরে থাকায় ছাত্রীটির রক্তশূন্যতা দেখা দিয়েছে। সূর্যের আলোয় না আসায় এবং হাঁটাচলা না করায় দেখা দিয়েছে হাড় ক্ষয়রোগ। পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে চর্মরোগ, আর মুখে ফাঙ্গাস। ছাত্রীটি শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। এভাবে কিছুদিন থাকলে যেকোনো মুহূর্তে মৃত্যু হতে পারত ছাত্রীটির। এখন তাকে সুস্থ করতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

বন্দিদশা থেকে উদ্ধার হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই তরুণী বলেন, রংপুরের একটি স্কুলে মানবিক বিভাগ থেকে তিনি ২০১১ সালে এসএসসি ও নবাবগঞ্জের একটি কলেজ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসি পাস করেন। লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন রয়েছে তার।

নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মশিউর রহমান বলেন, দুই বছরের বেশি সময় আটকে রাখার খবর পেয়ে ওই ছাত্রীর মাদ্রাসা শিক্ষক বাবাকে ডেকে পাঠান। ছাত্রীর বাবা ইউএনওকে জানান, ছাত্রীর মা ছাত্রীটিকে আটকে রেখেছেন। এরপর ইউএনও পুলিশ পাঠিয়ে ছাত্রীটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।

এই উদ্ধার অভিযানে যাওয়া নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আতিকুল ইসলাম বলেন, প্রেতিবেশীরা জানান, দুই বছরের বেশি সময় ধরে ওই ছাত্রীকে আটকে রাখা হয়েছিল।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মশিউর রহমান বলেন, এই সভ্য সমাজে কোনো পরিবার তার সুস্থ-স্বাভাবিক সন্তানকে এভাবে বন্দি করে রেখে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে, তা ভেবে অবাক হচ্ছেন। ছাত্রীটির চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয় তিনি বহন করবেন। ছাত্রীটিকে সুস্থ করে আবারও লেখাপড়া শুরু করাবেন।

 

"