বড় অপরাধে ছোট সাজা

ভয়ংকর সব অপরাধে পুলিশের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী
ama ami

প্রতিদিনই পুলিশ সদর দফতরে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ঘুষ, ডাকাতি, নারী কেলেঙ্কারি, নির্যাতন, প্রতারণাসহ খুনের মতো গুরুতর অপরাধও। অপরাধ দমনের দায়িত্ব যাদের ঘাড়ে, সেই পুলিশের বিরুদ্ধেই ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আগুন দেওয়া, জমি দখল, ধর্ষণ ও খুনের মতো ফৌজদারি অপরাধেও পুলিশের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ জমা হয়েছে। কিছু অসাধু সদস্যের কারণে গোটা পুলিশ বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বিব্রত হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুলিশ সদস্যদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা সঙ্গে বেড়েছে শাস্তির সংখ্যাও। ‘ব্যক্তির অপরাধের দায় বাহিনী নেবে না’Ñ পুলিশ সদর দফতরের এমন নীতিতে অপরাধী সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজিরও রয়েছে অনেক। অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুলিশে বড় ধরনের অপরাধ করে সাজা মিলছে কম। সাজা অনেকটা ‘লোক দেখানো’ গোছের। বড় অপরাধকেও ছোট করে দেখা হচ্ছে। আবার পুলিশের অপরাধ তদন্ত করতে গিয়ে কোনো ‘অপরাধ’ খুঁজে পায় না পুলিশ। কথিত ইমেজ রক্ষার নামে আড়াল করা হচ্ছে পুলিশের অপরাধ কর্মকান্ড। অথচ গুটিকয়েকজনের জন্য পুরো বাহিনীর সুনাম ক্ষুণœ হচ্ছে।

আবার মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা অপরাধী পুলিশ সদস্যকে শাস্তি থেকে বাঁচানোর জন্যই নানা চেষ্টা-তদবির করে থাকেন। ফলে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন অনেকে। তদন্তের নামে চলে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ। একপর্যায়ে ভুক্তভোগীরাও হতাশ হয়ে পিছুটান দেন। আবার ভুক্তভোগীদের ভয়-ভীতি দেখানো তো হরহামেশাই ঘটছে। এতে অপরাধে আরো ‘উৎসাহী’ করে তুলছে সাজাপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যকে। ফলে অপরাধ করেও সেই পুলিশ সদস্য পার পেয়ে যাচ্ছেন নিমিষেই। বাংলাদেশ পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) অনুযায়ী, কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রাথমিক শাস্তি হিসেবে তাকে কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করা হয়। বিধিমালা অনুযায়ী, অনেক সময় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সাময়িক বরখাস্ত করা হলে সঙ্গে প্রত্যাহার করা হয়ে থাকে। তবে শুধু প্রত্যাহার করা হলে সাময়িক বরখাস্ত নাও করা হতে পারে। বরখাস্ত করা হলে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য নিয়মিত বেতন না পেলেও শাস্তি চলাকালীন নির্দিষ্টহারে ভাতা পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে প্রত্যাহার করা হলে তার কর্মস্থল পরিবর্তন হলেও তিনি সব ধরনের সুবিধাই পেয়ে থাকেন। পরে অভিযোগ প্রমাণিত হলেই কেবল সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-১৯৮৫ অনুযায়ী অভিযুক্ত এসব পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

গুরুদন্ড, লঘুদন্ড, চাকরিচ্যুতি ও বাধ্যতামূলক অবসরÑ এই চার ধরনের শাস্তি রয়েছে পুলিশ বাহিনীতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশের শাস্তি বদলি, প্রত্যাহার বা সাময়িক বরখাস্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পুলিশ সদর দফতরে দেওয়া তথ্যমতে, ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাহিনীর প্রায় ৭৭ হাজার সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে প্রায় ৩৭ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ১০ হাজারেরও বেশি সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারিসহ বিভাগীয় মামলায় সাজা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অপরাধে জড়ানোর হার কমছে না। পুলিশ সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেছেন, পুলিশের কোনো সদস্যের অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। যখন কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তখন তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে যতগুলো লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে তার বেশির ভাগের প্রয়োজনীয় প্রমাণ দেখাতে পারেন না অভিযোগকারীরা। পুলিশের হয়রানির শিকার হবেন ভেবে অনেকে অভিযোগও করেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ঘটনা সত্য হলেও পার পেয়ে যান অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য।

পুলিশের আলোচিত অপরাধ : গত ৬ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে তিন যুবকের কাছে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ঘটনায় জড়িত দুই থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে শুধু প্রত্যাহার করেই দায় সেরেছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার সম্প্রতি মাদক চোরাচালানে জড়িত হয়ে পড়ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। প্রায়ই ইয়াবাসহ আটক হচ্ছেন পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য। এসব ঘটনায় বিব্রত পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা।

২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীর চিনিকলের জমি দখল নিতে গিয়ে পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লোকজনের ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশের গুলিতে তিন সাঁওতাল নিহত হন। পুড়িয়ে দেওয়া হয় সাঁওতালদের বাড়িঘর। ঘটনার দিন থেকেই বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের জন্য পুলিশকে দায়ী করেন সাঁওতালরা। ঘটনার কয়েক দিন পুলিশের অগ্নিসংযোগের একটি ভিডিও প্রচার করে বিদেশি গণমাধ্যম আল জাজিরা। দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন আদালত। কিন্তু ঘটনার আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও ‘দায়ী পুলিশ’ সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃশ্যত কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিলেটে পৈশাচিক নির্যাতনে বহুল আলোচিত শিশু রাজন খুনের ঘটনাটিকে ১২ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন থানার ওসি। সেই ওসি ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা বিচারাধীন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়নি।

২০১৫ সালের পহেলা বৈশাখের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে নারী নিপীড়নের ঘটনায় দায়িত্বে গুরুতর অবহেলার অভিযোগ ওঠে শাহবাগ থানার তিন পুলিশের বিরুদ্ধে। ঘটনা তদন্তে কমিটি করে ডিএমপি। কিন্তু জড়িতদের সাময়িক বরখাস্ত করেই দায়সারে পুলিশ। দায়ী পুলিশ সদস্যরা এখন বিভিন্ন থানায় পোস্টিংয়ে রয়েছেন।

এদিকে ২০১৩ সালের এপ্রিলে আবিদুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কোটি টাকা ঘুষ নেন ডিএমপি গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন ডিসি মোল্যা নজরুল ইসলাম। সেই মোল্যা নজরুল এখন সিআইডির সদর দফতরে বিশেষ পুলিশ সুপারের দায়িত্বে আছেন। একই বছরে বরিশালের তৎকালীন উপকমিশনার (উত্তর) জিল্লুর রহমান পদোন্নতি বাণিজ্যের কোটি কোটি টাকার ঘুষ তোলেন। ঘটনা ফাঁস হলে ৫০ লাখ টাকা ফেরতও দেন তিনি। এরপর বরখাস্ত হন। গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। কিন্তু আজও কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি।

আলোর মুখ দেখে না তদন্ত প্রতিবেদন : পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানিয়েছে, পুলিশি অপরাধের অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। এর মধ্যে যেসব ঘটনা ফাঁস হচ্ছে, কেবল সেগুলোই আলোচনায় আসছে। এর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে। আবার এসব প্রতিবেদনের বেশির ভাগই অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের পক্ষে। সাজাপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। কনস্টেবল থেকে এসআই পদের সদস্যরা ফৌজদারি অপরাধসহ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ নিয়মনীতি লঙ্ঘনে সবচেয়ে বেশি জড়াচ্ছেন। তবে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেলায় এই হার একেবারেই নগণ্য।

কেন এমন হচ্ছে : অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভাগীয় তদন্তের নামে অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। আর প্রত্যাহার বা সাময়িক বরখাস্তের নামে যে শাস্তি দেওয়া হয়, তা মূলত কোনো শাস্তির পর্যায়েই পড়ে না। কোনো বড় ঘটনা ঘটলে এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই বদলি, প্রত্যাহার, ক্লোজ এবং সাময়িক বরখাস্তের শাস্তি দেওয়া হয়। এসব শাস্তিতে সাময়িকভাবে কাজের ‘বিঘœ ঘটা’ ছাড়া কোনো প্রভাবই পড়ে না পুলিশ সদস্যদের মধ্যে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে বড় শাস্তি পেতে হয় না অভিযুক্তকে। ফলে প্রচলিত এই শাস্তি পুলিশের অপরাধ কমাতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছেন, অপরাধের দায়ভার একান্তই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির। পুলিশ বিভাগ কোনো অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয় না। এ ক্ষেত্রে সবসময়ই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

 

"