উপজেলায় প্রার্থী নির্বাচনে সতর্ক আওয়ামী লীগ

দুর্নীতির অভিযোগ ও মামলা থাকলে মনোনয়ন নয়

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

কাইয়ুম আহমেদ

একাদশ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় ধরে রাখতে আসন্ন উপজেলা নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে ক্ষমাতসীন আওয়ামী লীগ। তাই স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনেও প্রার্থী যাচাই বাছাইয়ে সতর্ক ও কঠোর অবস্থানে রয়েছে দলটি। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলেই তাকে মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাছাড়া প্রার্থী সৎ, যোগ্য ও শিক্ষিত কিনা এ তথ্য নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমেও। এদিকে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগেরও পাহাড় জমেছে ধানমন্ডির দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে। সুপারিশ পাঠানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলার নেতাদের প্রভাব খাটানোসহ নানা অভিযোগ করেছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। অভিযোগের পাশাপাশি তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ আর অভিমান। তবে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মনোনয়ন বোর্ড বসবে। সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে জনগণের কাছে ‘অধিকতর গ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তিকেই উপজেলায় মনোনয়ন দেওয়া হবে।

স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন সামনে রেখে গত সোমবার মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করে আওয়ামী লীগ।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন (চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে) ফরম বিক্রির শেষ দিন ছিল। আজ শুক্র ও কাল শনিবার গণভবনে দলের স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে এসব পদের জন্য দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। আর এ কারণে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মনোনয়নপ্রত্যাশী ও নেতাকর্মীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে।

সূত্র জানায়, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে গত সোমবার এবং ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে গত মঙ্গলবার থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে দলটি। চেয়ারম্যান পদে প্রতিটি মনোনয়ন ফরমের মূল্য ২০ হাজার টাকা এবং ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৫ হাজার টাকা। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, উপজেলা কমিটির বর্ধিত সভা থেকে এ নির্বাচনে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নের সুপারিশ পাঠানোর কথা। তার ভিত্তিতেই কেন্দ্র থেকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়ার নিয়ম। সে অনুযায়ী, তৃণমূল থেকে পাঠানো তালিকার ভিত্তিতেই ঢাকায় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু অনেক জায়গায় এমপিরা প্রভাব খাটিয়ে একক নাম পাঠাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠলে সেই ব্যবস্থা বদল করা হয়।

দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নির্দেশনা দেন, মনোনয়নের সুপারিশ নিয়ে কারো আপত্তি থাকলে তা লিখিতভাবে জানাতে হবে। এরপর যারা লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন, সুপারিশের তালিকায় নাম না থাকলেও তাদের কাছে মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু হয় মঙ্গলবার। গত বুধবার থেকে মনোনয়ন ফরম তোলার বিষয়টি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

সূত্র জানিয়েছে, বুধবার রাত পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ৭০০-এর মতো অভিযোগ দফতরে জমা পড়েছে। অনেক উপজেলা থেকেই একাধিক অভিযোগ এসেছে। অভিযোগ জমা দেওয়ার পর বগুড়ার

কাহালু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মোশফিকুর রহমান কাজল বলেন, তৃণমূল থেকে আমার নাম জেলাতে পাঠানোর পরে কেন্দ্রে এসে দেখি নাম নেই। পরে জানতে পারলাম, জেলা আওয়ামী লীগ একজনের নাম পাঠিয়েছে। এখানে স্বজনপ্রীতি হয়েছে। দলের ত্যাগী নেতা হিসেবে আমি মনোনয়নের দাবিদার। মনোনয়ন পাই বা না পাই, কেন্দ্র পর্যন্ত নাম আসবে না কেন?

এ বিষয়ে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান মজনু বলেন, অনেক উপজেলাতেই তৃণমূল থেকে একজনের নাম পাঠিয়েছে। যেখানে তিনজনের নাম এসেছে, সেখানে আমরা জেলা সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদক ঐকমত্যের ভিত্তিতে একক প্রার্থীর নাম পাঠিয়েছি। এখানে অন্য কোনো বিষয় নেই।

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মনোনয়নপ্রত্যাশী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. তোফাজ্জল হোসেন খান তোহাও ঢাকায় অভিযোগ জমা দিয়ে মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। তিনি বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় প্রার্থী বাচাইয়ের জন্য ভোট হয়, সেখানে ২২ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছি আমি। অথচ আমার ভোট ১৮ দেখিয়ে তাতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। জেলা থেকে কেন্দ্রে পাঠানো তালিকায়ও আমার নাম রাখা হয়নি।

পটুয়াখালী সদর উপজেলার চেয়ারম্যান পদে তিনজনের নাম সুপারিশ করে পাঠানো হয়েছে। তালিকায় প্রথম নাম এসেছে, স্থানীয় এমপি শাহজাহান মিয়ার ছেলে তারিকুজ্জামান মনির। তালিকার দুই নম্বর প্রার্থী এমপির ভাইয়ের ছেলে আবুল কালাম মৃধা। এই তালিকায় তিন নম্বর প্রার্থী হিসেবে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের নাম রাখা হয়েছে।

মির্জাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের মনোনয়নের সুপারিশে এক নম্বরে আছে গাজী আতাহার উদ্দীনের নাম। তিনি সংসদ সদস্য শাহজাহান মিয়ার ছোট ছেলে তারিকুজ্জামান রনির শ্বশুর। বর্তমান চেয়ারম্যান পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য খান মো. আবু বক্কর সিদ্দিকীর নাম ওই তালিকার তিন নম্বরে রাখা হয়েছে।

তৃণমূলের অভিযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, এমপি-মন্ত্রীরা নিজেরাই তো আছেন, আবার তাদের আত্মীয় স্বজনদের টানবেন কেন? তৃণমূল থেকে নাম পাঠানোর সময় কেউ কোনো অনিয়ম করল কিনা, সেটা আমাদের মনোনয়ন বোর্ড দেখবে। সঠিকভাবে নাম না এলে দলের জরিপ আছে। সব মিলিয়ে আমরা মনোনয়ন দেব।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো এবার উপজেলা পরিষদেও ত্যাগী নেতাদের অনেকেই মনোনয়নপ্রত্যাশী।

এ সম্পর্কে ওবায়দুল কাদের বলেন, চাওয়া তো অপরাধ নয়, দল করলে ত্যাগ করতে হয়। রাজপথে পুলিশের মার খেয়েছে, নির্যাতন সহ্য করেছে অনেকেই। অনেকে অত্যাচার ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে কর্মী থেকে নেতা হয়েছেন। কাজেই আশা আকাক্সক্ষা সবারই থাকতে পারে। কিন্তু মনোনয়ন তো সবাই পাবেন না।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কোনো প্রার্থীর পক্ষে তদবির থাকলে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। তবে স্থানীয় পর্যায় থেকে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ নেতারা সুপারিশ করলে বিষয়টি ভেবে দেখা হবে। গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরাই মনোনয়ন পাবেন। দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বা ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকলে তারা মনোনয়ন দৌড়ে ছিটকে পড়বেন।

দলীয় সূত্র জানায়, দুর্নীতিগ্রস্ত কিংবা অর্থ আত্মসাৎসহ যে কোনো মামলা রয়েছে, এমন কেউ যাতে মনোনয়ন না পায় তা খেয়াল রাখছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। এ বিষয়ে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। এ টিমের সদস্যরা মনোনয়নপ্রত্যাশী কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতি কিংবা কোনো মামলা রয়েছে কিনা সেই খোঁজখবর নেবেন।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা নির্বাচনে দলের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, যোগ্য ব্যক্তিরা প্রার্থী হোকÑ আমরা এটাই চাই। দলের সভাপতি শেখ হাসিনার ভিশন বাস্তবায়ন করতে হলে স্থানীয় সরকারকেও শক্তিশালী হতে হবে। কাজেই উপজেলা নির্বাচনে যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিকে আমরা মনোনয়ন দেব। প্রতিটি বিভাগে আওয়ামী লীগে একজন সাংগঠনিক সম্পাদক রয়েছেন। চুলচেড়া বিশ্লেষণ করেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনী বোর্ড মনোনয়ন দেবে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ের জরিপ দেখেও মনোনয়ন দেওয়া হবে।

 

"