প্রস্তুতি নিচ্ছে ছাত্রদল : কারচুপি হলে আন্দোলন গড়ার প্রত্যয়

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

বদরুল আলম মজুমদার

সরকারের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর কোনো কর্মসূচির চিন্তা বিএনপি না করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন নিয়ে দলের সিনিয়র নেতারা কাজ শুরু করেছেন। দলটি ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্যানেলের বিপরীতে ছাত্রদল ও সমমনা সংঠনগুলোর ঐক্য গড়ে শক্তিশালী প্যানেল দাঁড় করাবেন বলে জানা গেছে। বিএনপি নেতারা চান ডাকসুতে কারচুপি ও অনিয়ম হলে সেই ঘটনাকে সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার কাজে লাগাতে। ছাত্রদল নেতাদের ইচ্ছাও তাই। এ নিয়ে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী বৈঠকে এর মধ্যেই আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে আলোচনা উঠে আসে, এই নির্বাচনে কোনো ধরনের জালিয়াতি করা হলে তা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। সেটাকে পুঁজি করে ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জোরালো আন্দোলনের সূচনা করতে পারে। যা ঢেউ তুলবে সারা দেশে। তবে ছাত্রদল নেতারা জানিয়েছেন, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে তারা খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছেন না। তারা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি তারা সহঅবস্থান নিশ্চিত করতে না পারেন তাহলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাছাড়া ভোট কেন্দ্র হলের বাইরে না আনলে ডাকসুর ফল তাদের পক্ষে আসবে না।

১৯৯০ সালে ডাকসু নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছিল এবং জয়ীও হয়েছিল। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্যানেল ছিল আমান-খোকন-আলম পরিষদ। সেই সময় ছাত্রনেতা আমানউল্লাহ আমান, খায়রুল কবির খোকন ও নাজিমউদ্দিন আলমের নেতৃত্বাধীন প্যানেল জয়ী হয় ডাকসু নির্বাচনে। ডাকসুর কর্তৃত্ব নিয়ে ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এরশাদ সরকারবিরোধী তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। সর্বদলীয় ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে সব ছাত্র সংগঠনকে এক কাতারে নিয়ে এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

বিএনপির ভ্যানগার্ড ছাত্রদলের সেই সোনালি সময়টা এখনো ভোলেনি রাজনীতি সচেতনরা। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারাও সেই ভূমিকা আবারও দেখতে চান। এ কারণেই ডাকসু নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ দেশের রাজনীতির বাঁক বদলেছে বহুবার। ডাকসু নির্বাচনে কারচুপির ইস্যু কাজে লাগিয়ে বহু গণআন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। এবারও সেই রকমই একটি সুযোগ খুঁজছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। তাদের আশা ডাকসু নির্বাচনে কারচুপি না হলে ছাত্রদল জয়ী হবে।

আর ভোটে অনিয়ম হলে কিংবা একাদশ নির্বাচনের ছায়া পড়লে বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হবে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে সেটি সারা দেশে প্রভাব ফেলবে। তখন খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তীব্র করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। তবে তখনকার ছাত্রদল আর এখনকার ছাত্রদলের ভূমিকা ও শক্তি সামর্থ্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তখনকার ছাত্রদল সরকার ও প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথ কাঁপিয়েছিল। আর এখনকার ছাত্রদল বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তাদের নিরাপত্তা দিয়ে ক্যাম্পাসে নিতে হয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক কোনো কর্মসূচি দিতে পারেনি।

এদিকে দীর্ঘদিন পর ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে নড়েচড়ে বসেছে বিএনপি। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের অংশগ্রহণ করা নিয়ে যেমন ভাবতে হচ্ছে, তেমনি প্রার্থী বা প্যানেল নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভাবতে হচ্ছে দলটিকে। ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিলে বা না নিলে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে সে ব্যাপারে সাবেক ছাত্রনেতা, ছাত্রদলের বর্তমান সহ-সভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদক এবং ঢাবি ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে বিএনপি।

দলটির প্রচার সম্পাদক ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি রকিবুল ইসলাম বকুল বিষয়টির দেখভাল করছেন। এছাড়া গত মঙ্গল ও বুধবার ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদকদের সঙ্গে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে মতবিনিময় করেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। মতবিনিময়কালে ছাত্রদলের নেতারা খোলামেলা আলোচনা করেন। তাদের বক্তব্যগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনেন বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিপক্ষে মতামত দিয়েছেন অনেকে। তবে গণতন্ত্রের ঐতিহ্য হিসেবে দীর্ঘদিন পর এ নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন কেউ কেউ। নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে যারা তাদের মত হচ্ছে, সম্প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেভাবে হয়েছে, ডাকসু নির্বাচনও সেভাবেই হবে। কেননা ঢাবি ক্যাম্পাস ও হলগুলোয় ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান নেই। এমনকি হলের ভেতরে থাকবে ভোট কেন্দ্র সুতরাং এ ধরনের পরিস্থিতিতে ডাকসু নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

জানতে চাইলে বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে সাবেক ছাত্রনেতা থেকে শুরু করে বর্তমান ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আরো আলোচনা হবে। সার্বিকভাবে মনে হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতিতে ডাকসু নির্বাচনের কোনো পরিবেশ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সহাবস্থান নেই। ক’দিন আগেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার একজন নেতাকে ছাত্রলীগ বেদম পিটিয়ে আহত করেছে। তিনি বলেন, এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য বা বিবৃতিও আমরা দেখিনি। ভোটার ও প্রার্থীদের বয়স ৩০ বছর নির্ধারণ এবং হলের ভেতরে ভোট কেন্দ্র রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসবই করা হয়েছে একটি ছাত্র সংগঠনকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য। এসব থেকেই বোঝা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডাকসু নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট আন্তরিক নয়।

"