উপকূলে বিলুপ্তির পথে নানা প্রজাতির পাখি

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি
ama ami

জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ মানবসৃষ্ট নানা কারণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হয়ে পড়ছে। জনবসতির সম্প্রসারণ ও নির্দয়ভাবে উপকূলীয় বনাঞ্চলের গাছগাছালি কেটে ফেলার ফলে আশঙ্কাজনকভাবে উজার হচ্ছে বনভূমি। সংকুচিত হয়ে পড়েছে বহু বন্যপ্রাণীসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল। বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর বেঁচে থাকার প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বিলুপ্তির পথে এ অঞ্চলের প্রায় অর্ধশত প্রজাতির পাখি।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আইন থাকলেও তেমন কার্যকরী নয়। সর্বশেষ ভয়াবহ সিডর ও আইলার ধ্বংসযজ্ঞে সজীব বৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। যা আগামী ২০-৩০ বছরেও পূরণ হওয়া সম্ভব নয় বলে ধারণা পরিবেশবিদদের। উপকূলীয় এ অঞ্চল থেকে তিতির, কাঠময়ূর, বালিহাঁস, লাল মাছরাঙ্গা, চন্দনা, ঘুঘু, দোয়েল হরিয়ালসহ অনেক প্রজাতির পাখি হারিয়ে গেছে। নিশুতি রাতে ডাহুকের মিষ্টি ডাক আর শোনা যায় না। ভোরে ঘুম ভাঙলে এখন আর ঘুঘুর ডাক শোনা যায় না। নির্বিচারে শিকারের কারণে ঘুঘু পাখি বিলীন হতে চলেছে। বুলবুলি পাখিও এখন তেমন নজরে পড়ে না। কমে গেছে বাবুই পাখির সংখ্যাও। উঁচু তাল বা নারিকেল গাছে সুদৃশ্য বাবুই পাখির বাসা নজরে পড়ে না। রাতে ভুতুম প্যাঁচার ডাক শোনা যায় না। কাঠঠোকরার সংখ্যাও একেবারে কমে গেছে। আগে গরমকালে আকাশে অনেক চাতক উড়ত। বলা হতো চাতক উড়লে বৃষ্টি নামবে। সে চাতকের দেখা মিলে না। কমে গেছে চিলের সংখ্যাও।

খাল-বিলে দুই-চারটি চিলের কখনো দেখা মেলে। শিকারি পাখি বলে খ্যাত বাজপাখিও বিলীন হওয়ার পথে। প্রকৃতির সুইপার খ্যাত শকুন আর নেই। জঙ্গলি টিয়ার সংখ্যাও কমে গেছে। এখন আর টিয়া পাখি ঝাঁক ধরে আকাশে উড়তে দেখা যায় না। এক তথ্যে জানা যায়, গত অর্ধশতকে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা থেকে ৫০ প্রকার পাখির প্রজাতি হারিয়ে গেছে।

পাখির প্রজাতি বিলীন হওয়ার কারণ হচ্ছে মানুষের বসতি গড়া ও চাষাবাদের জন্য বন-জঙ্গল কেটে ফেলা। তা ছাড়া পাখির খাবারের পরিমাণও কমে গেছে। পাখির খাদ্য হচ্ছে গাছের ফল ও কীটপতঙ্গ। পাখির খাদ্যের মতো ফলবান বৃক্ষ খুব কম মেলে। জমিতে কীটনাশক ব্যাপক ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েছে। পাখির খাদ্য অনেক কীটপতঙ্গ নিঃশেষ হয়ে গেছে। জমিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত কীটনাশক ব্যবহারে ফলে ফসলের উপকারী পোকার সঙ্গে সাপ-ব্যাঙ মারা গেছে। সোনা ব্যাঙ ও কোলা ব্যাঙের সংখ্যাও অনেক কমে গেছে। বর্ষা নামলে ব্যাঙের ডাকের আওয়াজ তেমন শোনা যায় না। নানাভাবে নিধনের ফলে ঝাঁকে ঝাঁকে বক উড়তে খুব কম দেখা যায়। একসময় কালবৈশাখী ঝড়ের আগ মুহূর্তে ঝাঁক ধরে বক উড়ত। যা দেখতে আকর্ষণীয় লাগত। মানুষের নৃশংসতা ও বিপন্ন পরিবেশের কারণে উপকূলের বহু বন্যপ্রাণী বিলীন হয়ে গেছে বা হতে চলেছে। বনের ভেতর মাটির গর্তে এদের বাসা ছিল ভাম, নেউল, সোনালি বিড়াল, খাটাস, মেছবাঘ, বনবিড়াল, বন্য খরগোশ, লাফারু গুইসাপও বিলীনের পথে। পরিবেশ আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। পরিবেশবিদের অভিমতে জানা যায়, নির্বিচারে বনভূমি উজারের ফলে বন্যপ্রাণীর আবাস ধ্বংস হয়ে গেছে, দেখা দিয়েছে খাদ্যের অভাব। আর এসব বহুমুখী কারণে হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্যও।

বরগুনার সমি¥লিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. সোহেল হাফিজ বলেন, পাখিদের জন্য আলাদাভাবে ভাবার কোনো দফতর নেই। এ কারণে কত প্রজাতির পাখি হারিয়ে যাচ্ছে সে ব্যাপারে কোনো সমীক্ষা নেই। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত।

বরগুনায় পরিবেশ নিয়ে কাজ করে বেসরকারি সংস্থা এনএসএস’র নির্বাহী পরিচালক শাহাবুদ্দিন পাননা বলেন, দুর্যোগ জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিতে অধিক মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার, বনাঞ্চল ধ্বংসই পাখির প্রজাতিগুলো হারিয়ে যাওয়ার কারণ। পাখির প্রজাতিগুলোকে রক্ষা করতে তিনি পাখির অভয়ারণ্য বাড়নো, অবৈধ শিকারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও বনাঞ্চল তৈরির পরামর্শ দেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে বরগুনার কৃষি বিভাগের কর্মকতা এস এম বদরুল আলম বলেন জমিতে কীটনাশক কম ব্যবহারের জন্য কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে। পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে পাখি রক্ষা জরুরি।

প্রাণী সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা ডা. সৈয়দ আলতাফ হোসেন বলেন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য পাখির জাতগুলো আমাদের রক্ষা করতে হবে। তিনি আরো বলেন এজন্য পাখির অভয়ারণ্য বাড়াতে হবে জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার ও পাখি শিকার বন্ধ করতে হবে।

"