টি-টোয়েন্টির আমেজ তো এমনই

অভিষেকে আলিসের বিশ্ব রেকর্ড

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

প্রিন্স রাসেল
ama ami

নিষ্প্রাণ ম্যাচ, একেপেশে লড়াই, খাঁ খাঁ গ্যালারি, অসম্পূর্ণ প্রযুক্তি, রানখরাÑ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ষষ্ঠ আসরটা বড্ড ম্যাড়মেড়েভাবে চলছিল। এসব সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে আদর্শ একটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচই উপহার দিল বিপিএল। চার-ছক্কার বৃষ্টি, ব্যাটিং অর্ডারে ধস, হ্যাটট্রিক কিংবা শেষ ওভারের থ্রিলারÑ রংপুর রাইডার্স ও ঢাকা ডায়নামাইটস ম্যাচে কোন উপাদানটা ছিল না! আসলে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচের আমেজ তো এমনই হওয়ার কথা! বহু রং ছড়ানো ম্যাচে শেষ হাসি হাসল ঢাকা ডায়নামাইটস। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের তৃতীয় জয়ের উপলক্ষটা এনে দিয়েছেন অখ্যাত এক তরুণ আলিস আল ইসলাম। অভিষেক ম্যাচেই রাঙিয়ে দিয়েছেন ডানহাতি এই অফস্পিনার। প্রায় হারতে বসা ম্যাচে পাশার দান উল্টো দিয়েছেন নেট থেকে উঠে আসা ২৩ বছর বয়সী আলিস।

রংপুর রাইডার্স ইনিংসের ১৮তম ওভারে তুলে নিয়েছেন দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক। যা পাল্টে দিয়েছে ম্যাচের রং। আলিসের ওই ওভারে উইকেট পড়তে পারত আরো একটি। কিন্তু তৃতীয় বলে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান বেনি হাওয়েল। শেষ রক্ষা ফরাসি বংশোদ্ভূত ইংলিশ অলরাউন্ডারের। পরের ওভারে ঠিকই সুনিল নারাইনের শিকার হয়ে সাজঘরে ফিরে গেছেন তিনি। নিজের শেষ ওভারটি করতে এসে ৯ রান খরচায় দুই উইকেট তুলে নিয়েছেন ক্যারিবীয় অলরাউন্ডার। শেষ ওভারে রংপুর রাইডার্সের দরকার ছিল ১৪ রান। কাজটা রংপুরের জন্য যতটা কঠিন ততটাই সহজ ছিল ঢাকার কাছে। মাশরাফিদের যে ৯ উইকেট উইকেট পড়ে গেছে ততক্ষণে। হঠাৎ ধসে পড়া রংপুর লড়ল শেষ জুটিতে। আলিসের প্রথম দুই চার মেরে জয়টা হাতের মুঠোয় নিয়ে আসেন শফিউল ইসলাম। পরে ম্যাজিকাল ৪টি ডেলিভারি আলিসের। শেষ বলে ৪ রানের সমীকরণটা মেলাতে পারেননি শফিউল। বিপিএলে তৃতীয় ম্যাচটা ২ রানে জিতে অপ্রতিরোধ্য তকমাটা ধরে রাখল সাকিবের ঢাকা।

অথচ ম্যাচটা সহজেই জেতার কথা ছিল রংপুর রাইডার্সের। ১৮৪ রানের কঠিন লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। রাইলি রুশো ও মোহাম্মদ মিঠুনের ব্যাটিং দৃঢ়তায় ২ উইকেটে ১৪৬ রান তুলে ফেলেছিলেন মাশরাফিরা। এরপরই মড়ক লাগে রংপুরের ইনিংসে। ১৬ ও ১৭তম ওভারে ২ উইকেট খুইয়ে পথ হারায় রংপুর। ম্যাচের বাকি গল্পটা আলিসের। তার শেষ ২ ওভারের মাঝেরটিতে আলো ছড়িয়ে বোলিংয়ের পার্শ্ব নায়কের চরিত্রটা পেলেন নারাইন। যদিও ২ উইকেট নিতে গিয়ে ৪০ রান দিয়েছেন তিনি। তবে বোলিং কোটা পূর্ণ করে ২৬ রান খরচায় ৪ উইকেট নেওয়া আলিস অবধারিতভাবেই হয়েছেন ম্যাচ সেরা।

রংপুরের ইনিংসের শুরুটাও ছিল বিপর্যয় দিয়ে; জোড়া ধাক্কায়। ২৫ রানের মধ্যে সাজঘরে ফিরে গেলেন ক্রিস গেইল ও মেহেদী মারুফ। রংপুর রাইডার্স ক্যারিবীয় ব্যাটিং দানবের আউটটির জন্য দুঃখ করতে পারে। কারণ শুভাগত হোমের বলে উইকেটের ওপর দিয়ে গেইলের উড়িয়ে মারা শটটা ছক্কা হতে পারত। সেটা হতে দেননি তারই দুই স্বদেশি। শূন্যে লাফিয়ে বলটাকে মুঠোবন্দি করেন কাইরেন পোলার্ড। স্বাভাবিকভাবেই শারীরিক ভারসাম্য ধরে রাখতে পারেননি তিনি। বল ছুড়ে দেন আন্দ্রে রাসেলকে। ক্যারিবীয় যুগলবন্দিতে শুভাগত যে উইকেটটা পেয়েছেন সেটা রংপুর রাইডার্স অধিনায়ক মাশরাফির কাছে এক কথায় অসাধারণ। তবে ম্যাচ পরবর্তী সাংবাদিক বৈঠকে মাশরাফি জানালের গেইলের এভাবে আউট হয়ে যাওয়ায় মোটেও অবাক হননি। এমন ক্যাচ যে ক্যারিবীয়রা প্রায়ই ধরেন! এই দুর্দান্ত যুগলবন্দির ক্যাচটাই আড়াল করে দিয়েছে ঢাকার ফিল্ডারদের ক্যাচ মিসের মহড়াটা। না হলে জয়ের পথটা অনেক আগেই মসৃণ হতে পারত।

দুই ওপেনারের বিদায়ের পর ইনিংসের হাল ধরেন রাইলি রুশো। তৃতীয় উইকেট জুটিতে তাকে যোগ্য সঙ্গটাই দিয়েছেন মোহাম্মদ মিঠুন। দুজনেরই ঘাতক আলিস। ফেরার আগে ৪৪ বলে ৮৩ রানের বিস্ফোরক এক ইনিংস খেলে গেছেন রুশো। দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটসম্যানের ইনিংসটা সাজানো ছিল ৮টি চার ও ৪টি ছক্কায়। ১টি চার ও ২টি ছক্কা মারলেও মিঠুন ব্যাট করেছেন পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে। কিন্তু মাত্র এক রানের জন্য টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের নবম হাফসেঞ্চুরিটা পাননি মিঠুন। মুখোমুখি হওয়া ৩৫তম বলে উড়ে যায় তার স্টাম্প।

রুশো, মিঠুনের ব্যাটিং নৈপুণ্যে জয়ের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল রংপুর রাইডার্স। কিন্তু আচমকা বিপর্যয়ের কারণে ঢাকাকে হারাতে পারেনি তারা। নিশ্চিত জেতা ম্যাচে ২৪ রানে শেষ ৭টি উইকেট হারিয়ে টুর্নামেন্টের চতুর্থ ম্যাচে দ্বিতীয়বার হেরে যান মাশরাফিরা। কাল অবশ্য দিনের প্রথম লড়াইয়ে জিতেছিল রংপুরই। মুদ্রা নিক্ষেপের সুবিধা অনুকূলে পেয়ে প্রতিপক্ষ অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের হাতে ব্যাট তুলে দেন মাশরাফি।

ইনিংসের শুরুটা ভালো হয়নি ঢাকা ডায়নামাইটসের। শুরুতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে সাবেক চ্যাম্পিয়নদের টপঅর্ডার। ৩৩ রানে ৩ উইকেট হারানো ঢাকার চতুর্থ উইকেটের পতন হয়েছে ৬৪ রানে। সেখান থেকে ঢাকা চ্যালেঞ্জিং সংগ্রহে পৌঁছেছে দুই ক্যারিবীয়র ঝড়ে। ২৬ বলে ৬২ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলেছেন কাইরেন পোলার্ড। এই ঝড়ে ছিল ৪টি ছক্কা ও ৫টি চারের মার। শেষ দিকে ৩ ছক্কার ওপর দাঁড়িয়ে ১৩ বলে ২৩ রানের ক্যামিও ইনিংস এসেছে আন্দ্রে রাসেলের ব্যাট থেকে।

দুই ক্যারিবিয়ান রানের চাকের গতি সচল রেখেছেন। ঢাকা অধিনায়ক সাকিব টেনে ধরেছিলেন উইকেটের লাগাম। রাসেল-পোলার্ড যতটা আগ্রাসী ছিলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার ছিলেন ততটাই শান্তশিষ্ট। তার ৩৭ বলে ৩৬ রানের ইনিংসটিই এর প্রমাণ। ইনিংসে চার মাত্র ৪টি। এই ইনিংস খেলার পথে পঞ্চম উইকেট জুটিতে পোলার্ডকে নিয়ে সাকিব করেন ৭৮ রান। এই জুটিই মূলত ঢাকার চ্যালেঞ্জিং স্কোরের ভিতটা গড়ে দিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত ৯ উইকেটে ১৮৩ রান তুলতে সক্ষম হয় সাবেক চ্যাম্পিয়নরা। তাদের পতন হওয়া উইকেটের ৩টি নিয়েছেন শফিউল ইসলাম, বেনি হাওয়েল ও সোহাগ গাজীর শিকার ২টি করে। খালি হাতে ফেরেননি মাশরাফি, ফরহাদও। জবাব নিতে নেমে ৯ উইকেট হারিয়েছে রংপুরও। পার্থক্য একটাই, আভাস দিয়েও ম্যাচটার সুন্দর সমাপ্তি টানতে পারেনি তারা।

"