বিএনপির তৃণমূলে হতাশা ক্ষোভ

পরিস্থিতি সামাল দিতে আশাবাদী নেতারা

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

বদরুল আলম মজুমদার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবিতে বিএনপির তৃণমূলে চরম হতাশা বিরাজ করছে। আছে ক্ষোভও। দলটি টানা ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে রয়েছে। সব ঠিক থাকলে বিএনপিকে ক্ষমতায় যেতে হলে আরো অন্তÍত ৫ বছর অপেক্ষা করতেই হচ্ছে। কিন্তু এ অপেক্ষার প্রহর গুনতে বিএনপির মতো দলেন তৃণমূলের পক্ষে কীভাবে সম্ভব তা নিয়ে চিন্তিত দলের প্রথম সারির নেতারা। তারা মনে করছেন গ্রাম থেকে শহর সব এলাকায় দলের ওর্য়াড কমিটির নেতা থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত সবাই কম করে হলে ২০ থেকে ২৫টি মামলার আসামি। এসব মামলার অর্ধেকের মতো ২০১৪ সালের পর আন্দোলনকালীন জ্বালাও-পোড়াওয়ের মামলা। যার অধিকাংশ চার্জশিট পর্যায়ে আছে। তাই জেলজুলম এখন তাদের নিত্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় তৃণমূলকে কীভাবে চাঙা রাখা যায় এমন প্রশ্ন সামনে আসছে, এই পরিস্থিতিতে দল আবারও সর্বাত্মক আন্দোলনে যাবে কি না তার উত্তর খুঁজছেন শীর্ষ নেতারা।

বিএনপির দুই সিনিয়র নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের তৃণমূলে হতাশা আছে এটা সত্য তবে এটা যে বিএনপির রাজনৈতিক ব্যর্থতা তা কেউ বলছে না। দল হিসেবে বিএনপি গত ১০ বছরে যে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছে তা কেবল তৃণমূলের আত্মবিশ্বাসের কারণেই সম্ভব হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই সময়কাল যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে হতাশা বাড়বে কি না তা বলা যায় না। তবে আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে দেশে রাজনৈতিক দল হিসেবে যে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে বিএনপি এটার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে সামনের ধকলও তারা সইতে পারবেন।

দলের মধ্যম সারির একজন নেতা মনে করছেন শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকাটার কঠিন মূল্যই বিএনপিকে দিতে হচ্ছে। নির্বাচন থেকে সরে না গিয়ে মূলত গত ১০ বছরের রাজনৈতিক অর্জনটাকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। কেননা যে যুক্তিতে গত নির্বাচনে যায়নি বিএনপি সেই একই যুক্তিতে নির্বাচনের বাইরে থাকলে রাজনৈতিক মাঠটা অন্যরকম হতো। তাছাড়া দেশে-বিদেশে সরকার এতটা শক্তিও অর্জন করতে পারত না। রাজনৈতিক ভুলের কারণে এটা হয়েছে তা বলাই যায়। দলের আরেক নেতা বলছেন, নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকায় বিএনপির কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং নির্বাচন থেকে দূরে থাকলে প্রকৃত অবস্থাটা বিএনপির পক্ষে বুঝা সম্ভব ছিল না। এর বাইরে এবার যে পরিস্থিতি সরকার তৈরি করেছে তাও দেখতে পেত না আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। জিও পলিটিক্সের কারণে যেসব রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী সরকারে মিত্র হিসেবে কাজ করছে তারা বাদে আন্তর্জাতিক সব পক্ষ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যা অতিক্রম করা সরকারের পক্ষে আপাতত কষ্টকর না হলেও ভবিষ্যতে তাদের এর খেসারত দিতে হবে।

বর্তমান কৌশল নিয়েও হতাশ অনেকে। তারা মনে করছেন, মামলা হামলা তো এ সরকার কোনোভাবেই বন্ধ করবে না। তাই জীবনবাজি রেখে রাজনৈতিক মাঠে আন্দোলনের ঝড় তোলার বিকল্প দেখছেন না তারা। তবে দলের সিনিয়র নেতারা সেই মতের সঙ্গে কোনোভাবেই একমত নয়। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মাঠে তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলার কথা আমরা আপাতত চিন্তা করছি না। যে সময় যে রাজনীতি করতে হয় তা নিয়েই দলের কর্মসূচি প্রণয়ন করা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। এখন বাড়তি চাপ নিয়ে দলের নেতাদের হুমকির মুখে ফেলতে চান না জাতীয় নেতারা। তাই ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বসেই যাবতীয় কর্মসূচি নির্ধারণ করা হচ্ছে।

এদিকে গত মঙ্গলবার ফ্রন্টের নেতারা তিনটি নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এগুলো হলো জাতীয় সংলাপ, নির্বাচন ট্রাইব্যুনালে মামলা এবং নির্বাচনের সময় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা। ফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। দেশে একদলীয় একটি বলয় তৈরি করে এই অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। তাই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে দ্রুত নির্বাচন দাবি করছি আমরা।

এদিকে গত সোমবার দলের নয়াপল্টন অফিসে দলের মধ্যম সারির নেতাদের নিয়ে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন পার্টির মহাসিচব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত দলীয় খবর সংরক্ষণের জন্য একটি সেল গঠন করা হয়। এই সেলের প্রধান করা হয়েছে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে। এই সেল থেকে প্রয়োজনে নেতারা সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৈঠকে উপস্থিত এক নেতা বলেন, কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল ও টকশোর উপস্থাপক সরাসরি আমাদের বিপক্ষে চলে গেছেন। সেগুলোতে নেতাদের না যাওয়ার জন্যও পরামর্শ দিয়েছেন দলের সিনিয়র নেতারা। এছাড়া বিএনপি নেতা এবং সাংবাদিকসহ ১০ জনকে টকশোগুলোতে ডাকা হয় না। সেই বিষয়টিও আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের অন্য একটি সূত্র জানায়, বিএনপি নেতাদের টকশোতে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামীতে আরেকটি বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর বাইরে নির্বাচনী সহিংসতায় যেসব নেতাকর্মীর বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ সহায় সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সহযোগিতা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে শেষে নতুন সরকারের শপথ নিয়ে বক্তব্যে মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, যে নির্বাচনের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই সেই নির্বাচনের ফল আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। জনগণ পুরোপুরিভাবে এটাকে বর্জন করেছে বলা যেতে পারে। এই নির্বাচনের ফল কখনোই মেনে নেয়নি। সেই নির্বাচনের ফলের ভিত্তিতে পার্লামেন্ট বা সরকার গঠন নিয়ে মন্তব্য করার তো হাস্যকর ছাড়া কিছু না।

ফখরুল আরো বলেন, আমরা নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছি, পার্লামেন্ট প্রত্যাখ্যান করেছি এবং সরকার গঠন পুরোপুরিভাবে প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা বিশ্বাস করি, রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো অধিকার এই সরকারের নেই। জনগণ ভোট দিয়ে তাদের নির্বাচিত করেনি। বিএনপি এখন কী করবে এমন প্রশ্নে ফখরুল বলেন, বিএনপি এখন যা করার তা-ই করবে। জনগণের দল, গণতান্ত্রিক আন্দোলন করবে, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম করবে জনগণের সরকারের জন্য।

"