বিদায় বেলায় যা বললেন পুরনো মন্ত্রীরা...

প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক
ama ami

চমকের পর চমক। দলীয় মনোনয়ন, নির্বাচনী ইশতেহার, ভোটের মাঠের শৃঙ্খলা সব ক্ষেত্রেই ছিল নিপুন দক্ষতা। চমকের বিজয় ঘরে তুলে চমকে দিয়েছেন নতুন মন্ত্রিসভা গঠনেও। টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে এই চমক দেখিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পুরনো ৩৬ জনের জায়গায় স্থান দিয়েছেন নতুনদের। মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের শপথের আগে সচিবালয়ে নিজেদের শেষ কর্মদিবসে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়ে নতুনদের জায়গা দিতে পুরনোদের সরে যাওয়া চিরায়ত নিয়মের কথাই বলেছেন বিদায়ী মন্ত্রীরা। গতকাল সোমবার দুপুরের পর শেখ হাসিনার চতুর্থ মেয়াদের সরকারের সদস্যরা শপথ নেন। এই সরকারে বাদ পড়েছেন গত সরকারের প্রবীণ মন্ত্রীদের প্রায় সবাই।

নতুন সরকারের শপথের আগে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে বিদায় নেন।

তোফায়েল আহমেদ : সদ্য বিদায়ী বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, নতুনদের জায়গা দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী সুন্দর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যারা মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন তারা সবাই যোগ্য। প্রধানমন্ত্রী উনার পছন্দমতো যোগ্য, সৎ ও আদর্শবান ব্যক্তিদের নিয়েই কেবিনেট করেন। আমার মনে হয় তিনি সেজন্যই করেছেন ও ভালোই করেছেন। আমরা তো এমপি হিসেবে সংসদে থাকবই। এই সরকারের সফলতা কামনা করি।

তোফায়েল বলেন, ‘২৮ বছর বয়সে প্রথম প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর পলিটিক্যাল সেক্রেটারি নিযুক্ত হয়েছিলাম। পরবর্তীতে ’৭২ থেকে ’৭৫ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বিশেষ সহকারী ছিলাম। এর ২১ বছর পর ’৯৬ সালের ২৩ জুলাই শপথ নিয়ে ২৪ জুলাই সচিবালয়ে এসেছি। দীর্ঘ ৯ বছর আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগসহ মহাজোট বিপুলভাবে জয়ী হয়েছে। এরই মধ্যে তিনি বিশ্ববিখ্যাত, জননন্দিত, আন্তর্জাতিক নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। এটি স্বাভাবিক যে নতুনদের জায়গা দিতে হয়। প্রধানমন্ত্রী সেই কাজটিই করেছেন।’

আবুল মাল আবদুল মুহিত

সদ্য বিদায়ী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘এখন থেকে অবসর সময়ে বই পড়ব ও লেখালেখি করব। আমার কালেকশানে ৫০ হাজার বই আছে। এগুলো সব পড়া হয়নি। চিন্তা করছি অবসরে গিয়ে এগুলো পড়তে শুরু করব। আরেকটি কাজ আমি করব। সেটা হচ্ছে এই পড়ার ওপরে আমি লেখালেখি করব।’ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে দেওয়া বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মুহিত এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘আমাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়নি। আমি নিজ ইচ্ছায় অবসরে যাচ্ছি। এটি একটি বিরল সম্মান ও সৌভাগ্যও বটে। ৮৫ বছর বয়সেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতো একটি জটিল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছি। গত ১০ বছরে বাংলাদেশ একটি পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। এই ১০ বছর সূচারুভাবে দায়িত্ব পালন করেছি।’

বিদায়ী অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘একসময় বাংলাদেশের পরিচয় ছিল ভিখারি দেশ হিসেবে। আজ বাংলাদেশ সে অবস্থানে নেই। আল্লাহর রহমত এবং সহকর্মীদের সহযোগিতা এই দুর্লভ কাজ করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। আমি বিশ্বাস করি, আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশ যে অবস্থানে যাবে এবং বাংলাদেশের যে অগ্রগতি সূচিত হবে সেখান থেকে নামিয়ে আনার সাধ্য কারো হবে না।’

অর্থ সচিব আবদুর রওফ তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিদায়ী প্রতিমন্ত্রী এবং নতুন মন্ত্রিসভায় নিয়োগ পাওয়া পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, সিজিএ মুসলিম চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।

মোহাম্মদ নাসিম

বিদায়ী স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য এবং কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখাপত্র মোহাম্মদ নাসিম নতুন মন্ত্রিসভাকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ বিপুল ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার প্রতি যে আস্থা জ্ঞাপন করেছে নতুন মন্ত্রিপরিষদের মাধ্যমে সেই আস্থার প্রতিফলন সফলভাবে রূপায়িত হবে।

গত দশ বছর ধরে জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে যেভাবে সরকার পরিচালিত হয়েছিল আগামীতেও তা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছি।

নুরুল ইসলাম নাহিদ

বিদায়ী শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, ‘আমার যে কৃতিত্ব তা আপনাদের সবার। আমি যা নই তার চেয়ে বেশি দায়িত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ কৃতিত্বের অধিকারী করেছেন। তিনি দায়িত্ব দিয়েছেন বলেই আমার এই কৃতিত্ব। তবে এই কৃতিত্ব সবার। আমি আমার দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি।’ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অগ্রগতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় কর্মকর্তাদের অবদান রাখার আহ্বান জানান নাহিদ।

নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘দীর্ঘ ১০ বছরে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন হয়েছে। শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা হয়েছে। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা আধুনিক করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছি। শিক্ষা পরিবারের সবার সহযোগিতায় আমরা একটি পর্যায়ে পৌঁছেছি। এটা সবার অবদান।’

নাহিদ বলেন, ‘নতুন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি একজন অভিজ্ঞ বিচক্ষণ মানুষ। শিক্ষা পরিবারের যে অগ্রগতি তা তিনি এগিয়ে নিয়ে যাবেন। আপনারা সবাই তাকে সহযোগিতা করবেন। গত ১০ বছরের সফলতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করবেন।’

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়াউল হক, এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (কলেজ) অধ্যাপক শামসুল হুদাসহ বিভিন্ন দফতর পরিদফতরের প্রধান ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী কল্যাণ সমিতির নেতারা বিদায়ী বক্তব্য দেন।

কামরুল ইসলাম

সদ্য বিদায়ী খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, ‘নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের স্বাগত জানাই। নতুনদের জন্য জায়গা করে দিতে হয়, এটাই নিয়ম। নতুন যে মন্ত্রী দায়িত্বে আসছেন, তিনি তিনবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তিনি মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখবেন।’

কামরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন ও পুরনোদের নিয়ে সময়োপযোগী মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। বিগত পাঁচ বছর আমাকে যেভাবে সহায়তা করেছেন, নতুন মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারকেও আপনারা সেভাবে সহযোগিতা করবেন উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে।’

কামরুল ইসলাম আরো বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নতুন ও পুরনোদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন তা দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে। এই মন্ত্রিসভা সময়োপযোগী।’

সদ্য বিদায়ী নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা খুব বাস্তবমুখী। তার এই অগ্রযাত্রায় সবাই সাহসী ভূমিকা পালন করবেন বলে আশা প্রকাশ করছি।’

শাজাহান খান বলেন, ‘আমার মেয়াদে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এখনো কিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব অসমাপ্ত প্রকল্পের কাজ দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে।’

সদ্য বিদায়ী এই মন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ একজন রাষ্ট্রপরিচালক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বিচক্ষণতার সঙ্গে নতুন এই মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। নতুনদের কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। কর্মউদ্দীপনা নিয়ে আমাদের কাজ করে যেতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত রোববার নতুন মন্ত্রিসভার ৪৭ সদস্যের নাম ঘোষণা করা হয়েছে । এই মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ ৩১। পুরনোদের মধ্যে ৩৬ জন বাদ পড়েছে।

 

"