মহান বিজয় দিবস আজ

মুক্তিকামী বাঙালির স্বপ্নের দিন

প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

হাসান ইমন
ama ami

মুক্তিকামী বাঙালির স্বপ্নের দিন আজ ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনেই বাঙালি অর্জন করেছিল প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা। দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার আলবদর, আলশামসদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, অকাতরে প্রাণ দিয়ে, এ দিনেই বাঙালি বিজয় ডানা মেলে মুক্তির আকাশে। পৃথিবীর মানচিত্রে জš§ নেয় স্বাধীন-সার্বভ্রৌম রাষ্ট্রÑ বাংলাদেশ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃতে নয় মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের এই দিনে বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের। এ দিনেই বীরের জাতি হিসেবে পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশ করে বাঙালি। আর সব দিনের চেয়ে আজ আরো বেশি আলো ছড়াবে আকাশ। আরো বেশি শব্দ তুলে ডানা ঝাপটাবে পাখি। আলোয় আলোয় নাচবে উঠোন। সমবেত সুর, কণ্ঠ ও মুঠোবদ্ধ হাত তুলে আকাশে, মানুষ তুলবে ডাক গলার সবচেয়ে উঁচু পর্দা থেকে ‘জয় বাংলা’। গাইবে গান ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকায় মাথা’।

স্বাধীনতার ৪৮ বছরের মাথায় অনেক অর্জন নিয়ে নতুন করে এলো দিনটি। রাজনৈতিকভাবে এক নতুন প্রেক্ষাপটে ও আস্বাদে নতুন বিজয় দিবস এবার। দেশে জাতীয় নির্বাচনের আমেজ। আগামী ৩০ ডিসেম্বর ভোট। সব রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে নির্বাচনে। পুরো দেশ সরব নির্বাচনী উৎসবে। একদিকে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ; অন্যদিকে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে ভোটযুদ্ধে লিপ্ত বিএনপি। যে জামায়াতে ইসলামী একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মিলে যৌথভাবে মেতে উঠেছিল নির্বিচারে বাঙালি নিধনযজ্ঞে; স্বাধীনতার মাত্র একদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর যে ঘাতকরা পাশবিকভাবে হত্যা করেছিল দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের; যুদ্ধাপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় যে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল; সেই জামায়াত এবারও বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে অংশ নিয়েছে নির্বাচনে। যুদ্ধাপরাধের কারণে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন বাতিল করে দেওয়ায় বিএনপি নিজেদের প্রতীক ধানের শীষ দিয়েছে, তাদের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের এই প্রধান শরিক জামায়াতকে।

ফলে এবারের বিজয় দিবস স্বাধীনতার পক্ষে অসাম্প্রদায়িক মানুষের জন্য নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে। বিজয় দিবস পালিত হবে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক শক্তির ধারক-বাহকদের প্রত্যাখ্যান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে বিজয়ী করার প্রত্যয়ে উজ্জীবত জাতি দিবসটি পালন করবে।

১৯৭১ সালের পৌষের এমনই এক পড়ন্ত বিকেলে পাকিস্তান বাহিনীর চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় বাঙালির। ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তৈরি মঞ্চে পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক জোন-বি এবং ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর নেতৃত্বে আত্মসমর্পণ করে ৯১ হাজার ৫৪৯ জন পাকিস্তানি সেনা। আত্মসমর্পণ দলিলে বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে সই করেন পাকিস্তানের পক্ষে জেনারেল নিয়াজী ও মিত্রবাহিনীর পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। আনন্দে গর্জে ওঠে উৎফুল্ল জনতা। জন্ম নেয় এক নতুন দেশ ‘বাংলাদেশ’।

আনন্দ-উৎসব ও শোক-শ্রদ্ধায় অভূত সম্মিলনে দেশের সর্বত্রই আজ পালিত হবে দিবসটি। রাজধানী ঢাকা ও প্রধান শহরগুলো ছাড়িয়ে উৎসবের রং ছড়িয়ে পড়বে নিভৃত গ্রামেও। দেশ সাজবে বিজয়ের সাজে। সুউচ্চ ভবনগুলোর আলোকসজ্জা আলোকিত করবে প্রাণ। মানুষ নামবে পথে। গালে-কপালে এঁকে লাল সবুজ পতাকা, শিশু হাসবে ও হাঁটবে। মেলা বসবে। নাগরদোলা নাচবে। উৎসবের সমারোহে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে জাতি স্মরণ করবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, প্রবাসী সরকারের নেতারা, সেক্টর কমান্ডার আর খ্যাত-অখ্যাত সব মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ বুদ্ধিজীবী, বীর বীরাঙ্গনাকে। স্মরণে, শোকে ও শ্রদ্ধায়, ফুলে ফুলে ছেয়ে যাবে স্মৃতিসৌধ, সমাধি।

দিবসটি পালনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন তারা। যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান বিজয় দিবস উদযাপনের লক্ষ্যে এবার জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ঢাকায় প্রত্যুষে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হবে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে উপস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।

দিনটি সরকারি ছুটির দিন। সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাসমূহ আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হবে। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক, সড়কদ্বীপসমূহ জাতীয় পতাকা ও অন্যান্য পতাকায় সজ্জিত করা হবে। ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিভিন্ন বাহিনীর বাদক দল বাদ্য বাজাবেন। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে এদিন সংবাদপত্রসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। এ উপলক্ষে ইলেকট্রনিক মিডিয়াসমূহ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের চিত্রাঙ্কন, রচনা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করবে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ স্মারক ডাক টিকিট প্রকাশ করবে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও নেতৃত্বাধীন ১৪ দল, জাতীয় সংসদের বিরোধী জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দেশব্যাপী দিনভর নানা কর্মসূচি নিয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনসহ জিয়ারত, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা ইত্যাদি।

 

"