ফিরে আসে বিজয়

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

বিশেষ প্রতিনিধি
ama ami

একাত্তরের এ দিনে অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকায় ঢুকে পড়ে। রাস্তায় নেমে আসে নিরস্ত্র জনতা। রক্তে শুধু সশস্ত্র গর্জন। পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে লড়ছে, মরছে। তবু চাই প্রতিশোধ স্বজন হারানোর। আকাশ, জলে, স্থলে- সবদিকে অবরুদ্ধ হানাদাররা। আকাশ নিয়ন্ত্রণে ভারতীয় বিমানবাহিনীর। নিরুপায় জেনারেল নিয়াজি রাওয়ালপিন্ডিতে আরজি পাঠান, ‘আরো সাহায্য চাই।’

আজ ১৩ ডিসেম্বর। একাত্তরের এই দিনে চারদিকে উড়তে থাকে বাঙালির বিজয় নিশান। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় শত শত পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে। শুধু ময়নামতীতেই আত্মসমর্পণ করল ১ হাজার ১৩৪ জন। আর সৈয়দপুরে ৪৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়কসহ ১০৭ পাকিস্তানি সেনা। খুলনা, বগুড়া ও চট্টগ্রামে হানাদারদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনী ও স্থানীয় মানুষের অবিরাম যুদ্ধ চলে। মুজিবনগরে তখন চরম উত্তেজনা। রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্টুডিওতে বসে বার্তা বিভাগীয় প্রধান কামাল লোহানী, আলী যাকের ও আলমগীর কবির ঘন ঘন সংবাদ বুলেটিন পরিবর্তন ও পরিবেশন করেন। ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা মুক্ত হওয়ার খবর আসছে প্রতি মুহূর্তে।

যুদ্ধ জয়ের নিশ্চয়তা জেনেই বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে জাতিসংঘের যেসব কর্মী, কূটনৈতিক, প্রতিনিধি ও বিদেশি নাগরিক নিরাপদে সরে যেতে চান বাংলাদেশ সরকার তাদের সম্ভাব্য সব সুযোগ-সুবিধা দেবে।’

শত্রুমুক্ত হয় বগুড়ার কাহালু উপজেলা। মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার অধ্যক্ষ হোসেন আলী সহযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে দুপুর ১২টার পর কাহালু থানা চত্বরে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছে তিনি প্রথমে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। কাহালু উপজেলাকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করেন। শতাধিক পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। আত্মসমর্পণ করানোর পর তাদের বগুড়ার গোকুল ক্যাম্পে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। পাকিস্তান হানাদারমুক্ত হয় মানিকগঞ্জ।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল শফিউল্লাহর ‘এস’ ফোর্স ঢাকার উপকণ্ঠে ডেমরা পৌঁছায়। পূর্ব ও উত্তর দিক থেকে মিত্রবাহিনী ঢাকার প্রায় ১৫ মাইলের মধ্যে পৌঁছে যায়। ৫৭ নম্বর ডিভিশনের দুটো ব্রিগেড এগিয়ে আসে পূর্বদিক থেকে। উত্তর দিক থেকে আসে জেনারেল গন্ধর্ব নাগরার ব্রিগেড এবং টাঙ্গাইলে নামে ছত্রীসেনারা। পশ্চিমে ৪ নম্বর ডিভিশনও মধুমতী পার হয়ে পৌঁছে পদ্মার তীরে। রাত ৯টায় মেজর জেনারেল নাগরা টাঙ্গাইল আসেন। ব্রিগেডিয়ার ক্লের ও ব্রিগেডিয়ার সান সিং সন্ধ্যা থেকে টাঙ্গাইলে অবস্থান করছিলেন। রাত সাড়ে ৯টায় টাঙ্গাইল ওয়াপদা রেস্ট হাউসে তারা পরবর্তী যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় বসেন। মেজর জেনারেল নাগরা মুক্তিবাহিনীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা যদি আমাদের বিনা বাধায় এতটা পথ পাড়ি দিতে সাহায্য না করতেন, তাহলে আমাদের বাহিনী দীর্ঘ রাস্তায় যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ত। রাস্তাতেই আমাদের অনেক শক্তি ক্ষয় হয়ে যেত।

নিয়াজীকে জানানো হয়, এ দিন পাকিস্তান বাহিনীর সহায়তার জন্য ‘মিত্রদের’ যে এসে পৌঁছানোর কথা ছিল, তা আটচল্লিশ ঘণ্টার জন্য পিছিয়ে গেছে। পাকিস্তানের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব চীনকে সামরিক হস্তক্ষেপের ব্যাপারে রাজি করাতে ইসলামাবাদে সারা দিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যায়। পিকিংয়ে পাকিস্তানি দূতাবাসকেও দেখা যায় কর্মতৎপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের এই মিলিত প্রচেষ্টার ফলে সিকিম-ভুটান সীমান্তে মোতায়েন চীনা সেনাবাহিনীকে কিছুটা তৎপর দেখা যায়। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের মুলতবি বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব সোভিয়েত ভোটের মুখে যথারীতি বাতিল হয়ে যায়।

"