উইন্ডিজের বিরুদ্ধে দাপুটে জয়েও খচখচানি

প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

প্রিন্স রাসেল
ama ami

বাংলাদেশের একাদশটাই উপহার দিয়েছিল বিস্ময়। প্রথমবারের মতো এক ম্যাচেই চার ওপেনার নিয়ে মাঠে নামিয়ে বাজি ধরেছে টাইগাররা টিম ম্যানেজমেন্ট। তাতে যে সুফলটা প্রত্যাশা ছিল, সেটার প্রতিফলন খুব একটা ঘটেনি। গতকাল রোববার মিরপুরে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের প্রথমটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সহজে মাশরাফিরা হারিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তৃপ্তি আসেনি ওপেনারদের ব্যাটিংয়ে।

ব্যাটিং বিভাগে তৃপ্তির যে ঘাটতি ছিল, সেটার পুরোটাই পুষিয়ে দিয়েছে বোলিং বিভাগ। ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে মাত্র চার ওভার করা মুস্তাফিজুর রহমান আগুন ঝরিয়েছেন বল হাতে, গুঁড়িয়ে দিয়েছেন অতিথিদের লোয়ার অর্ডার। মাশরাফি বিন মর্তুজা ধস নামিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের টপ অর্ডারে। অবধারিতভাবে হয়েছেন ম্যাচ সেরাও। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ২০০তম ম্যাচটা এর চেয়ে দারুণভাবে রাঙাতে পারতেন না বাংলাদেশ অধিনায়ক!

দ্যুতি ছড়িয়েছেন স্পিনাররাও। মেহেদী হাসান মিরাজ এবং সাকিব আল হাসান দুজনের শিকারই একটি করে। কিন্তু উইকেট সংখ্যায় এ মানিকজোড়ের বোলিং মাহাত্ম্য বোঝানো কঠিন। বল হাতে দুজনই ছিলেন মিতব্যয়ী। দুজন ২০ ওভারে দিয়েছেন ৬৬ রান। হাত খরচায় মিরাজের চেয়ে ছয় রান বেশি ছিল সাকিবের। দুই পেসার মুস্তাফিজ এবং মাশরাফি যৌথভাবে খরচ করেছেন আরো কমÑ মাত্র ৬৫। বোলিংয়ের কোটা পূর্ণ করা বাংলাদেশ অধিনায়ক দিয়েছেন ৩০ রান।

তার সমান তিন উইকেট শিকার করেছেন মুস্তাফিজ। সতীর্থরা যখন ক্যারিবীয়দের চাপে রেখে বোলিং করেছেন সেখানে ব্যতিক্রম রুবেল হোসেন। বল হাতে যথেষ্ট উদার ছিলেন তিনি। পাঁচ বোলারের ইনিংসে রুবেল একাই দিয়েছেন ৬১ রান!

শিশির প্রভাবক হয়ে উঠতে পারে। ওয়ানডে সিরিজ শুরুর আগে অনুমানটা এমনই ছিল। মুদ্রা নিক্ষেপের লড়াইটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ম্যাচ শুরুর এই লড়াইয়ে ভাগ্য বিমুখ করেছে বাংলাদেশকে। টসের সুবিধা অনুকূলে নিয়ে সতীর্থ কাইরেন পাওয়েল এবং শাইপ হোপের হাতে ব্যাট তুলে দেন ক্যারিবীয়দের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক রভম্যান পাওয়েল।

আগে ব্যাট করতে নামা ওয়েস্ট ইন্ডিজের শুরুটা হয়েছে মন্দের ভালো। ২৯ রানে তাদের উদ্বোধনী জুটি বিচ্ছিন্ন করেন সাকিব। ৬৫ রানে ক্যারিবীয়দের দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রস্থান হয়েছে দুই বছর পর মাঠে ফেরা ড্যারেন ব্রাভোর, সাজঘরমুখী হওয়ার আগে অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যান করেছেন ১৯ রান। ওপেনার পাওয়েল কোনো রকম দুই অঙ্ক ছুঁয়েই বিদায় নিয়েছেন।

আশার আলো দেখাচ্ছিলেন শাই হোপ। তার পথচলা থামিয়ে দিয়েছেন মাশরাফি। হোপকে মিরাজের ক্যাচে পরিণত করেছেন টাইগার কাপ্তান। ব্রাভোকেও একই পরিণতি দিয়েছিলেন ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’। এই উইকেটের জন্য তামিমের পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন মাশরাফি। লং অফ অঞ্চল থেকে চিতার বেগে দৌড়ে এসে ডিপ এক্সট্রা কভারে কী দুর্দান্ত ক্যাচটাই না ধরেছেন চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরা বাঁ-হাতি ওপেনার! অথচ এই ব্রাভো-ই দুই-দুইবার ক্যাচ দিয়ে বেঁচে গেছেন।

তামিম যেখানে অবিশ্বাস্য ক্যাচ ধরেছেন সেখানে সতীর্থদের হাত হয়ে উঠেছিল পিচ্ছিল। পুরো ইনিংসে চারটি ক্যাচ ছেড়েছেন বাংলাদেশের ফিল্ডাররা। এমন সুবর্ণ সুযোগ পাওয়ার পরও শক্তিশালী সংগ্রহ করতে পারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। মাশরাফিদের তোপের মুখে ক্রমেই ধুঁকতে থাকে তারা। শেষ দিকে রোস্টন চেজ (৩২) এবং কিমো পলের (৩৬) ক্যামিও ইনিংসের ওপর দাঁড়িয়ে ৯ উইকেটে ২০০ কাছাকাছি পৌঁছায় ক্যারিবীয়রা।

১৯৬ রানের লক্ষ্যমাত্রা সহজেই ছুঁয়েছে বাংলাদেশ। সেটা মিডল অর্ডার ব্যাটস্যামনদের সৌজন্যে। অথচ যেসব ওপেনারদের নিয়ে প্রত্যাশার বেলুন উড়িয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট সেটা ছিদ্র হয়ে গেছে। ভালো একটা শুরুর পরও ৪২ রানের মধ্যে ফিরে গেছেন তামিম ইকবাল (১২) ও ইমরুল কায়েস (৪)। তামিমের সঙ্গে উদ্বোধনী জুটিতে থাকা লিটন দাশ অবশ্য হাফসেঞ্চুরির আভাস দিয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি। আউট হয়েছে সৌখিন শট নিতে গিয়ে।

৪৭ বলে পাঁচটি চারে ৪১ রান করে আউট হয়েছেন লিটন। কিমো পলকে উড়িয়ে মারতে গিয়েছিলেন তিনি। উল্টো তার স্ট্যাম্প উড়িয়ে ফেলেছেন ক্যারিবীয় পেসার। ৮৯ রানে দলের তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে লিটন ফিরে যাওয়ার পর কিছুটা শঙ্কা পেয়ে বসেছিল দলকে। সেটা উড়িয়ে দিয়েছে চতুর্থ উইকেটে মুশফিকুর রহিম ও সাকিবের ৫৭ রানের জুটি। জুটি ভাঙে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের বিদায়ে। ২৬ বলে চারটি চারের সুবাদে ৩০ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে সাজঘরে ফিরেছেন সাকিব।

ছয়ে নেমে ঝড় শুরু করেছিলেন সৌম্য সরকারও। যা দর্শকদের বিনোদনের খোরাক হয়ে থাকল। সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। দুটি চার ও একটি ছয়ে তার পথচলা থামিয়ে দিয়েছেন চেজ। ১৯ রানে আউট হয়েছেন এই বাঁ-হাতি। তাতে অবশ্য খুব একটা ক্ষতি হয়নি বাংলাদেশের। ততক্ষণে দল যে জয়ের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে! বাংলাদেশকে সহজে জিততে পেরেছে মুশফিকের সৌজন্যে। ৭০ বলে ৫৫ রানের কার্যকর ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়েই মিরপুরের বাইশ গজ ছেড়েছেন মুশি। ইনিংসটি তিনি সাজিয়েছেন পাঁচটি চারে।

নিষ্প্রাণ ম্যাচে বাংলাদেশ জিতেছে পাঁচ উইকেট ৮৯ বল হাতে রেখে। এমন দাপুটে জয়ের পরও খচখচানি থাকল। নেপথ্য কারণ- ওপেনারদের ব্যাট থেকে প্রত্যাশিত রান না পাওয়া এবং এক হালি ক্যাচ ফেলা। যেমনই হোক, এই জয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল টাইগাররা। জয়ের আত্মবিশ্বাসটা তাজা থাকতেই আগামীকাল সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ম্যাচে নেমে পড়ছে স্বাগতিক শিবির। মাশরাফিদের লক্ষ্য এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ পকেটে নেওয়া।

"