ফিরে আসে বিজয়

প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

বিশেষ প্রতিনিধি

মিত্রবাহিনী দ্রুত ঢাকা পৌঁছার লক্ষ্য নিয়ে চারদিক থেকে অগ্রসর হতে থাকে। আগে একটি বাহিনী যাচ্ছে আশুগঞ্জ, দাউদকান্দি ও চাঁদপুর। পশ্চিমে আরেকটি বাহিনী পৌঁছেছে মধুমতী নদীর তীরে। আরেকটি বাহিনী কুষ্টিয়ামুক্ত করে চলছে গোয়ালন্দ ঘাটের দিকে। হালুয়াঘাট থেকে এগিয়ে আসা বাহিনীও পৌঁছে গেছে ময়মনসিংহের কাছাকাছি।

আজ ৯ ডিসেম্বর। একাত্তরের এই দিনে ঢাকার আশপাশের জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান মুক্ত হওয়ার খবর আসে। আজ হানাদারমুক্ত হয় খুলনার ঐতিহ্যবাহী কপিলমুনি। কুমারখালী (কুষ্টিয়া) উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধারা বেলা ১১টায় শহরের চারদিক ঘিরে ফেললে পৌর এলাকার কু-ুপাড়ায় ক্যাম্প করা আলবদর কমান্ডার ফিরোজ বাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুুদ্ধ হয়। এ সংবাদে জেলা শহরে অবস্থানরত পাকিস্তান সেনারা দ্রুত এসে শহর ঘিরে গণহত্যা শুরু করে। পাল্টা আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা শহর ঘিরে রাজাকার-পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালালে তারা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়।

এদিকে, কুমিল্লা মুক্ত হওয়ার খবরে দাউদকান্দি এবং চান্দিনার মুক্তিযোদ্ধারা দ্বিগুণ উৎসাহে পাকিস্তান সেনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। আগের রাতে মুক্তিযোদ্ধারা উত্তর এবং দক্ষিণ পাশ থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেওয়া পাকিস্তান সেনাদের ওপর হামলা চালালে তারা পাল্টা জবাব দিতে পশ্চিমদিকে হটতে থাকে। পরে একাত্তরের এই দিনে পাকিস্তান সেনারা ঢাকার দিকে পালিয়ে যায়। এদিনে আরো মুক্ত হয় খুলনার পাইকগাছা, কুমারখালী, গাইবান্ধা, অভয়নগর, ত্রিশাল, পূর্বধলাসহ বিভিন্ন এলাকা।

একাত্তরের এ দিন ভারতীয় সেনাবাহিনীকে পুনর্বার আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মানেকশ। পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তোমরা যদি বাঁচতে চাও, অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করো। নতুবা তোমাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হবে।

নাজুক পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের সদর দফতর ঢাকা থেকে একটি সংকেতবাণী পাঠানো হয় রাওয়ালপিন্ডিতে। বার্তায় প্রথমবারের মতো জেনারেল নিয়াজী স্বীকার করলেন, পরিস্থিতি নিদারুণ সংকটপূর্ণ। আকাশে শত্রুর প্রভুত্বের কারণে সৈন্য পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ও সংকটাপূর্ণ। তবে রেডিও পাকিস্তান থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন নুরুল আমিন। ভাষণে তিনি পাকিস্তানিদের ঐক্যবদ্ধভাবে ‘ভারতীয় হামলা’ মোকাবিলা ও ‘দুরভিসন্ধি’ নস্যাৎ করার আহ্বান জানান। মিত্রবাহিনীর সমালোচনা করে বলেন, তাদের নগ্ন হামলায় অসংখ্য বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে।

অন্যদিকে, মুক্তিযুুদ্ধকে নস্যাৎ করতে অব্যাহত থাকে যুুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা। পাকিস্তানকে সহযোগিতা করতে যুুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সন তার সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা হতে আদেশ দেন। উদ্দেশ্য, মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া। কিন্তু তা সফল হয়নি। উল্টো মুক্তিযোদ্ধারা বীর বিক্রমে দাউদকান্দি, গাইবান্ধা, কপিলমুনি, ত্রিশাল, নকলা, ঈশ্বরগঞ্জ, নেত্রকোনা, পাইকগাছা, কুমারখালী, শ্রীপুর, অভয়নগর, পূর্বধলা, চট্টগ্রামের নাজিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা হানাদারমুক্ত করে আজ।

বিকেলে কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনীর কমান্ডার জগজিৎ সিং অরোরা বলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দুদিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এক অংশ রয়েছে হিলির উত্তরে, আরেক অংশ দক্ষিণে। দুই অংশের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের আক্রমণ মিত্রবাহিনীর আক্রমণের গতিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। জয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিনি আরো বলেন, ওরা (পাকিস্তানিরা) কী করবে জানি না, কিন্তু আমরা বড় ধরনের লড়াইয়ের জন্য তৈরি।

চীনের অস্থায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী চি পেং ফি এক ভাষণে বলেন, ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরু করেছে। স্বীকৃতি দিয়েছে তথাকথিত বাংলাদেশকে। জাতিসংঘের অধিবেশনে প্রতিনিধিত্বকারী পাকিস্তানি দলের নেতা মাহমুদ আলী দেশে ফিরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করেন এবং সাংবাদিকদের কাছে সোভিয়েত ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, সোভিয়েতের উচিত বিশ্বশান্তির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ভারতের পাশ থেকে সরে দাঁড়ানো। এমনকি পাকিস্তানকে সমর্থন করায় চীন ও আমেরিকার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা এবং আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও জাতীয় কংগ্রেসের সমন্বয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভারত ও ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের পর পরিষদের এটিই ছিল প্রথম বৈঠক। বৈঠকে মুক্ত এলাকায় অসামরিক প্রশাসনের কার্যক্রম শুরু এবং খাদ্য, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। মিত্রবাহিনীর বিমানবাহিনী টাঙ্গাইলের নিকটবর্তী কোনো এক এলাকায় ৭০০ ছত্রীসেনা এবং ৮০ টন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে।

"