তাবলিগের দুই গ্রুপে বিভক্তি

কাকরাইলে পাসপোর্ট আটকে রাখার অভিযোগ

জুবায়েরপন্থিদের ৬ দফা

প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক ও গাজীপুর প্রতিনিধি

বিশ্ব ইজতেমায় তাবলিগের আমির কে হবেনÑ এ নিয়ে দুই বছর ধরে সাদপন্থি ও জুবায়েরপন্থিদের মধ্যে বিরোধ চরমে উঠেছে। তাদের এ বিরোধ সর্বশেষ ভয়ংকর সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। চলমান এ বিরোধ মেটাতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দেনদরবার হচ্ছে। কিন্তু দৃশ্যত তা যেন নিষ্ফল হয়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে একপক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে দেখা যাচ্ছে। তাদের এই বিরোধ এবং জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিশ্ব ইজতেমার জমায়েত অনুষ্ঠানের তারিখ পিছিয়েছে। আগামী মাসে যেকোনো সময় বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে গতকাল শনিবার দেশে তাবলিগ জামাতের মারকাজ কাকরাইল মসজিদে সাদবিরোধীরা বিদেশ থেকে আসা তাবলিগ কর্মীদের পাসপোর্ট, টাকা ও মালামাল আটকে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া, বিদেশি তাবলিগ কর্মীদের বিভিন্ন স্থানে যেতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন সাদ অনুসারীরা। পাসপোর্ট ও নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফেরত না পাওয়ায় দেশে ফিরতে পারছেন না ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা আটজন তাবলিগ কর্মী। ইতোমধ্যে তারা পাসপোর্টসহ মালামাল ফেরত পাওয়ার জন্য ব্যবস্থা নিতে ঢাকায় ইন্দোনেশিয়ার দূতাবাসে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

অন্যদিকে যথাসময়ে দুই পর্বের ইজতেমা করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণসহ ৬ দফা দাবিতে গতকাল গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভুরুলিয়া এলাকায় তাবলিগ জামাতের গাজীপুর মারকাজে সংবাদ সম্মেলন করেন জুবায়েরপন্থি আলেমরা। তারা গত ১ ডিসেম্বর টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে ওলামায়ে কেরাম, মাদরাসার ছাত্র ও সাধারণ তাবলিগি সাথিদের ওপর হামলায় জড়িতদের বিচার ও শাস্তি দাবি করেন।

কাকরাইল মসজিদ সূত্রে জানা গেছে, বিদেশ থেকে আসা তাবলিগ কর্মীদের জন্য কাকরাইল মসজিদে একটি আমানতখানা রয়েছে। এখানে বিদেশি তাবলিগ কর্মীদের পাসপোর্ট, বিমানের টিকিট, টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র রাখা হয়। এমনকি অনেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ভ্রমণে যাওয়ার আগে বেশি টাকা সঙ্গে না নিয়ে এই আমানতখানায় রেখে যান।

তাবলিগ সূত্র জানিয়েছে, টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার আগে থেকেই বিভিন্ন দেশ থেকে তাবলিগের অনুসারীরা আসা শুরু করেন। অনেকেই ইজতেমার আগে এক চিল্লা (৪০ দিন) সময় দেন বাংলাদেশ তাবলিগের কাজে। ইজতেমা শেষ করে তারা দেশে ফেরত যান। আবার কেউ কেউ ইজতেমা শেষে বাংলাদেশে তাবলিগের কাজে সময় ব্যয় করেন। টঙ্গীতে দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও হেনস্তার কারণে এ বছর সেই সংখ্যা কমার শঙ্কা রয়েছে।

জানা গেছে, ইজতেমা ও ইজতেমাপূর্ব ‘জোড়’-এ অংশ নিতে ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কিছু দেশের তাবলিগ কর্মী ঢাকায় এসেছেন। তাদের মধ্যে কয়েকটি জামাত (দল) ইন্দোনেশিয়া থেকে নভেম্বরে বাংলাদেশে আসে। তাদের কয়েকজন ৪ ডিসেম্বর দুপুরে নিজেদের পাসপোর্ট, টাকা ও জিনিসপত্র নেওয়ার জন্য কাকরাইল মসজিদে যান। তাদের সহযোগিতা করার জন্য সঙ্গে ছিলেন সাদ অনুসারী তাবলিগ কর্মী খোরশেদ আলম। ওই দিন বিকেলে ইন্দোনেশিয়ান নাগরিকরা রমনা থানায় মৌখিকভাবে অভিযোগ জানান। পরে ৫ ডিসেম্বর তারা ঢাকায় ইন্দোনেশিয়ার দূতাবাসে লিখিত অভিযোগ করেন।

ইন্দোনেশিয়া জামাতের পাঁচ অনুসারী বর্তমানে মিরপুরের একটি মসজিদে অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে একজন ডিকি রোমানতাসা বলেন, ‘আমাদের পাসপোর্ট, জামাকাপড় ও টাকা কাকরাইল মসজিদ থেকে ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। থানায়ও গিয়েছিলাম, কোনো সমাধান পাইনি। টাকার জন্য আমাদের চলাফেরায় সমস্যা হচ্ছে। আমাদের মধ্যে অনেকের দেশে ফেরত যাওয়ার কথা ছিল। পাসপোর্ট ফেরত না পাওয়ার কারণে তারা ফেরত যেতে পারছেন না। বিমানের টিকিটের তারিখ পরিবর্তন করতে হয়েছে। আমরা বুঝতে পারছি না, এখন কী করব।’ একই অভিযোগ সওয়ার্দি রুস্তমের। তিনি বলেন, ‘আমাদের অপরাধ কী জানি না। আমাদের টাকা-পয়সা, পাসপোর্ট কী কারণে আটকে রাখা হয়েছে, তাও বলা হয়নি। আমরা ভীতি এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।’

এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও গুজব বলছেন সাদবিরোধীরা। তাবলিগে সাদবিরোধী অংশের নেতা ড. আজগর বলেন, ‘তারা (সাদ অনুসারী) নানাভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। নানাভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।’ সাদ অনুসারী তাবলিগের মুরব্বি মাওলানা আবদুল্লাহ মনছুর বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশি নয়, বিদেশিরাও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা মেহমানদের পাসপোর্ট ও ডলার আটকে রাখা হয়েছে। বেশ কয়েকজন ভয়ে মালামাল না নিয়েই দেশে ফিরে গেছেন। কোথাও কোথাও বিদেশি মেহমানদের বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে।’

জুবায়েরপন্থিদের সংবাদ সম্মেলন : ইজতেমা আয়োজনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণসহ ৬ দফা দাবিতে গতকাল গাজীপুরে সংবাদ সম্মেলন করেছেন জুবায়েরপন্থি আলেমরা। তারা গত ১ ডিসেম্বর টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে ওলামায়ে কেরাম, মাদরাসার ছাত্র ও সাধারণ তাবলিগি সাথিদের ওপর হামলায় জড়িতদের বিচার ও শাস্তি দাবি করেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মুফতি তাওহীদুল হক বলেন, তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে সর্বজনীন কিছু উসুলের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। সময়ের পরিক্রমায় ইজতেমার মুরব্বিরা মারা যাওয়ার পর তাদের শূন্যস্থান পূরণ না করে হঠাৎ মাওলানা সা’দ নিজেকে আমির দাবি করে এককভাবে গুরুত্বপূর্ণ দাওয়াতি ও আমলি কাজের ফয়সালা দিতে থাকেন। এ ছাড়া তিনি কোরআন ও হাদিসের নিজস্ব মতামত ও মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে ওলামায়ে কেরামদের বিরাগভাজন হন। তিনি তাবলিগের মূল উসুল থেকে সরে গিয়ে নতুন নতুন উসুলের সমাবেশ ঘটান। বিশেষ করে আমভাবে মাসআলা বয়ান করে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। তার কার্যকলাপের ওপর বহুবার তাকে সতর্ক করা হয়। এতদসত্ত্বেও তিনি নিজস্ব মতাদর্শের ওপর অটল থাকেন। এ ব্যাপারে প্রথমে নিযামউদ্দিনে বিভেদ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে নিযামউদ্দিন থেকে বড় বড় ওলামায়ে কেরাম প্রতিবাদস্বরূপ বের হয়ে নিজ নিজ এলাকায় চলে যান।

সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা ছয় দফা দাবিগুলো হচ্ছেÑ ওয়াসিফ-নাসিমগং ও প্রত্যক্ষভাবে হতাহত করার কাজে জড়িতদের ন্যায়বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ওয়াসিফ-নাসিম পদালোভী ব্যক্তিদের তাবলিগের সুরা থেকে বহিষ্কার করা, টঙ্গী ময়দান অনতিবিলম্বে ময়দানের সুরার সাথিদের তত্ত্বাবধানে ফিরিয়ে আনা, যথাসময়ে দুই পর্বে ইজতেমা করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা, কাকরাইল ও টঙ্গীর ময়দান মাওলানা সা’দ-ওয়াছিফপন্থিদের কবল থেকে মুক্ত করা এবং যেহেতু জমহুল ওলামায়ে কেরাম ও মাশায়েকদের দৃষ্টিতে মাওলানা সা’দ কোরআন-হাদিসের পরিপন্থী ও শরিয়ত ও আকিদাবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি লালন করছেন। তাই সা’দপন্থি বিভ্রান্ত ফেরকার কোনো কার্যক্রম বাংলাদেশে চলতে না দেওয়া।

"