শেষ হলো ৩ দিনের আপিল আবেদন

আপিলেও খালেদার মনোনয়ন বাতিল

ফিরলেন : মোরশেদ খান, আফরোজাসহ বিএনপির অন্তত ৭৫, আ.লীগের ২ এবং নাজমুল হুদাসহ শতাধিক স্বতন্ত্র * বাদ : কাদের সিদ্দিকী, আমান

প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিভক্ত রায়ে প্রার্থিতায় অযোগ্য থাকলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গতকাল শুনানির তৃতীয় ও শেষ দিনে তার প্রার্থিতা বাতিলের রায় বহাল রাখে ইসি। একই সঙ্গে ঢাকা-৯ আসনে বিএনপি প্রার্থী আফরোজা আব্বাসের এবং চট্টগ্রাম-৮ আসনের একই দলের প্রার্থী মোরশেদ খানের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে বাদ পড়েছেন ঢাকা-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী আমান উল্লাহ আমান ও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী।

গত ২ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। গতকাল শনিবার আপিল শুনানিতে রিটার্নি কর্মকর্তার রায় বহাল রাখল ইসি। তিনি তিন সংসদীয় আসনে ফেনী-১, বগুড়া-৬ ও ৭ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ (সিইসি) তিন কমিশনার বাতিল বহাল রাখার পক্ষে রায় দিলেও অপর নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার মনোনয়নপত্রের বৈধতা দেওয়ার রায় দেন। দুই দফা শুনানি শেষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে খালেদা জিয়ার সব আসনের মনোনয়নপত্র বাতিলে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়া আদেশই বহাল রাখা হয়।

গত রোববার তিন আসনে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন সংশ্লিষ্ট জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এরপরই দলীয়ভাবে খালেদা জিয়ার মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করা হয়। গতকাল শনিবার তার আপিল আবেদনের ওপর সকাল ও দুপুরে দুই দফা শুনানি হয়। প্রথম দফা শুনানি শেষে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বৈধ বলে রায় দেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। এরপর নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র অবৈধ বলে রায় দেন। তিনি বলেন, দুর্নীতির দুই মামলায় খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। তিনি নির্বাচনের অযোগ্য। এ কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হলো। অপর নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম ও ব্রিগেডিয়ার শাহাদৎ হোসেন চৌধুরীও একই যুক্তি দেখিয়ে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা ও অন্য কমিশনারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।

ফিরলেন আফরোজা আব্বাস ও মোরশেদ খান, বাদ পড়লেন আমান : অন্যদিকে, ঢাকা-৯ আসনে বিএনপি প্রার্থী আফরোজা আব্বাসের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। গত ২ ডিসেম্বর ঋণখেলাপি হিসেবে তার প্রার্থিতা স্থগিত করেন রিটার্নিং অফিসার। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন তিনি। গত শুক্রবার আপিল শুনানি হলেও তা স্থগিত রাখা হয়। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় শুনানির তৃতীয় দিনে আফরোজা আব্বাসের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে ইসি।

এদিকে ঢাকা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী আমান উল্লাহ আমানের মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল খারিজ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ফলে তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

অন্যদিকে, আপিলের শুনানিতে বাতিল হওয়া প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা এম মোরশেদ খান। তৃতীয় দিনের শুনানিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা নেতৃত্বাধীন আপিল কর্তৃপক্ষ তার আবেদন মঞ্জুর করে। মোরশেদ খান চট্টগ্রাম-৮ আসনে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। তবে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ দাখিল না করায় এবং বিদ্যুতের বিলখেলাপি হওয়ায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।

শুনানি শেষে মোরশেদ খান সাংবাদিকদের বলেন, প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট। নির্বাচন কমিশন আমার প্রতি সদয় আচরণ করেছে।

গতকাল শনিবার সকাল ১০টায় নির্বাচন কমিশনের অস্থায়ী এজলাসে একাদশ সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হওয়া মনোনয়নপত্রের ওপর শুনানি শুরু হয়।

দুই শতাধিক প্রার্থী প্রার্থিতা ফিরে পেলেন

গতকাল শনিবার (শেষ দিন) সন্ধ্যা পর্যন্ত আবেদন করা ৫৪৩ প্রার্থীর মধ্যে ২০৮ জন তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রথম দিনে ৮০ জন, দ্বিতীয় দিনে ৭৮ জন এবং শেষ দিনে ৫০ জন। গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত দুই শতাধিক প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত বিএনপির ৭৫ এবং শতাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জাসদ, জেএসডি, জাকের পার্টি, ঐক্যজোট, ইসলামী আন্দোলন, এনপিপি, বিএনএফ, সিপিবিসহ একডজন দলের অর্ধশত প্রার্থী রয়েছেন।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, ভোটের ইতিহাসে এত সংখ্যক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আপিল আবেদনের শুনানি হয়নি। আজ রোববার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। রাজনৈতিক দলগুলোকে আজকের মধ্যে চূড়ান্ত প্রার্থী নিশ্চিত করতে ইসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাতে হবে। তা না হলে প্রতীক বরাদ্দের সময় নতুন করে জটিলতায় পড়তে হবে দলগুলোকে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় একক ও জোটের প্রার্থী ঘোষণা করার কাজ গুছিয়ে এনেছে। বিএনপি দুই শতাধিক আসনে একক প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছে।

ইসির তথ্য মতে, জোটের প্রার্থীকে দলীয় প্রতীক দিলে সংশ্লিষ্ট আসনে প্রধান দলের প্রার্থীদের প্রার্থিতা স্বয়ংক্রীয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। জোটের কারো একক প্রার্থী থাকলে শরিক দলের অন্যদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার হবে না। জোটের একক প্রার্থী রাখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দলের প্রার্থীকে নিজ উদ্যোগেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে হবে।

এ নির্বাচনে ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ৩ হাজার ৬৫ প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী সংখ্যা ২ হাজার ৫৬৭ ও বাকি ৪৯৮ জন স্বতন্ত্র। নির্বাচনে ২৯৫ আসনে বিএনপির ৬৯৬ জন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ২৬৪ আসনে ২৮১ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। গত ২ ডিসেম্বর রিটার্নিং কর্মকর্তারা জমা হওয়া সব মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করে ৭৮৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। এর মধ্যে বিএনপির ১৪১ ও আওয়ামী লীগের তিনজন রয়েছেন। পরে কমিশনে ৫৪৩ জন আপিল করেন। আপিলকারীদের মধ্যে অন্তত ২০ জনের প্রার্থিতা বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আপিল জমা হয়। বাকি সবাই প্রার্থিতা ফিরে পেতে আবেদন করেন। সিইসি কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের কমিশন এসব আপিল আবেদন নিষ্পত্তি করেন।

ফিরলেন যারা : সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গতকাল শনিবার যাদের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির চাঁদপুর-৪ আসনের জেড খান মো. রিয়াজউদ্দিন, বান্দরবান পার্বত্য জেলা মা ম চিং, চট্টগ্রাম-৮ এম মোরশেদ খান, রাজশাহী-৫ মো. আবুবকর সিদ্দিক, রাজশাহী-৬ মো. আবু সাঈদ চাঁদ, টাঙ্গাইল-১ ফকীর মাহবুব আনাম স্বপন, ঢাকা-১৭ শওকত আজিজ, ঢাকা-১৯ মো. কাফিল উদ্দিন, নীলফামারী-১ আসনের এ আহম্মেদ বাকের বিল্লাহ (মুন) ও রাজশাহী-৫ মো. নাদিম মোস্তফা। এদিন বিএনপির যেসব প্রার্থী আবেদন করেও প্রার্থিতা ফিরে পাননি, তাদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৫ মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ঝিনাইদহ-২ মো. মশিউর রহমান, ও চাঁদপুর-৪ আসনের বিএনপির হারুন অর রশীদ।

শনিবার রাত ৯টা পর্যন্ত আপিল শুনানি অব্যাহত থাকায় পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। এর আগে দুদিনে বিএনপির ৬০, আওয়ামী লীগের ২, গণফোরাম ২, এলডিপি ৩, জাকের পার্টি ১২, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৮, জাসদ ৪, জেএসডি ২, সিপিবি ৫, ইসলামী ঐক্যজোট ৪, এনপিপি ৪, বিএনএফ ২, খেলাফত মজলিস ২, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১, বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্ট ৩, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ১ ও মুসলিম লীগের ২ জন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।

"