ফিরে আসে বিজয়

প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

বিশেষ প্রতিনিধি

আরেকটি আগুনঝরা দিন আসে বাঙালির সামনে। একাত্তরের এ দিনেই বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে পাকিস্তান বাহিনী। মিত্রবাহিনীর আকাশ ও স্থলে শানিত আক্রমণে দিশাহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তান সেনারা। তখন ঢাকার দিকে পালানোর পথ বন্ধ। বন্ধ একের সঙ্গে অন্যের যোগাযোগও। এমনই এক পরিস্থিতিতে আকাশ থেকে বিভিন্ন ভাষায় হানাদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণের বাণীসংবলিত লিফলেট ছড়িয়ে দেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মানেকশ। জেনারেল জগজিৎ সিংকে সেনা নিয়ে দ্রুত ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ আসে। একটি ব্রিগেডকে নির্দেশ দেওয়া হয় দ্রুত হালুয়াঘাটের দিক থেকে ময়মনসিংহের দিকে অগ্রসর হতে। জেনারেল মানেকশ আশ্বাস দেনÑ আত্মসমর্পণ করলে পাকিস্তান বাহিনীর প্রতি জেনেভা কনভেনশনের রীতি অনুযায়ী সম্মানজনক ব্যবহার করা হবে। আকাশবাণী বেতার থেকে সে আহ্বান বারবার বিভিন্ন ভাষায় প্রচারও করা হয়।

বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানি বেসামরিক গভর্নর ডা. মালেক মুক্তিবাহিনীর দাবি মেনে নিয়ে একটি সমঝোতায় উপনীত হতে পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের পরামর্শ দিয়ে ইসলামাবাদে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। আজ তা প্রত্যাখ্যাত হয়। তার সে পরামর্শ ও জেনারেল মানেকশর আত্মসমর্পণের নির্দেশ উপেক্ষা করে পাকিস্তান সেনাদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেয় পাকিস্তান সামরিক শাসকরা। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তে থাকে। প্রতিটি রণক্ষেত্রেই মুক্তিবাহিনীর নিকট একের পর পরাজিত হতে থাকে পাকিস্তান বাহিনী। পূর্ব সীমান্ত থেকে জেনারেল জগজিৎ সিংয়ের প্রায় সব কটা বাহিনীই দ্রুত গতিতে ঢাকার দিকে আসতে থাকে।

পাকিস্তান হানাদারমুক্ত হয় ময়মনসিংহের গৌরীপুর। শত্রুমুক্ত হয় চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার মিরসরাই। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণের মুখে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী মিরসরাই ছেড়ে পালিয়ে যায়। বিজয় উল্লাসে মাতোয়ারা হয় মিরসরাইয়ের মানুষ। মুক্ত হয় কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাক্ষণবাড়িয়াও। কুমিল্লার আপামর জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে মুক্তির উল্লাসে বরণ করে নেয়। কুষ্টিয়ার মিরপুর থানায় কমান্ডার আফতাব উদ্দিন খান ১৭০ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে গান স্যালুটের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। ৬৫ জন পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দোসর ও রাজাকার পাহাড়পুর মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে আত্মসমর্পণ করে।

পশ্চিম পাকিস্তানে এহেন নাজুক পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে রাওয়ালপিন্ডির সামরিক কর্তারা নিয়াজীর মনোবল ফিরিয়ে আনতে ‘চীনের তৎপরতা শুরু হয়েছে’ বলে তাকে জানান। এমন শোচনীয় সামরিক পরিস্থিতির মধ্যে ইয়াহিয়া খান বেসামরিক প্রতিনিধিদের হাতে তার শাসনক্ষমতা হস্তান্তরের দীর্ঘদিনের ‘ওয়াদা’ বাস্তবায়িত করতে শুরু করেন। ‘পূর্ব পাকিস্তান’ থেকে নুরুল আমিন ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী ও উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। তবে সন্ধ্যায় সর্বশেষ সামরিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির আলোকে ভারতের সরকারি মুখপাত্র ঘোষণা করেন, পাকিস্তান যদি পূর্ব বাংলায় তাদের পরাজয় স্বীকার করে নেয়, তবে অন্য সব অঞ্চলেই ভারত যুদ্ধ বন্ধ করবে। বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো অঞ্চলেই কোনো ভূখ- দখল করার অভিপ্রায় ভারতের নেই।

এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি পালন এবং সেনা প্রত্যাহারের জন্য ভারত ও পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করে। প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ পরিষদে ভারতীয় প্রতিনিধি সমর সেন বলেন, পাকিস্তানকে অবশ্যই বাংলাদেশকে স্বীকার করে নিতে হবে। উপমহাদেশে শান্তি পুনঃস্থাপনের জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে জাতিসংঘের কোনো প্রস্তাবই বাস্তবায়ন করা যাবে না।

"