ফিরে আসে বিজয়

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

বিশেষ প্রতিনিধি

মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি নিয়ে উৎকর্ণ তখন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা। উদ্বিগ্ন কলকাতার প্রিন্সেপ স্ট্রিট থিয়েটার রোড, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বাংলাদেশ মিশনসহ শরণার্থী শিবির ও যুব অভ্যর্থনা কেন্দ্রের সব বাঙালিই। ঠিক তখনই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ভুটান।

আজ ৭ ডিসেম্বর। যুদ্ধ পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে রাওয়ালপিন্ডি হেড কোয়ার্টারে গোপন বার্তা পাঠান জেনারেল নিয়াজি। বার্তায় উল্লেখ করেন, চারটি ট্যাংক রেজিমেন্ট সমর্থিত আট ডিভিশন সৈন্য নিয়ে আক্রমণ শুরু করেছে ভারত। তাদের সঙ্গে আরো আছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৬০ থেকে ৭০ হাজার বিদ্রোহী (মুক্তিযোদ্ধা)। তিনি আরো লেখেন, স্থানীয় জনগণও আমাদের বিরুদ্ধে। দিনাজপুর, রংপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লাকসাম, চাঁদপুর ও যশোর প্রবল চাপের মুখে রয়েছে। পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠতে পারে।

বার্তায় নিয়াজী আরো লেখেন, গত ৯ মাস ধরে আমাদের সৈন্যরা কার্যকর অপারেশন চালিয়েছে এবং এখন তারা তীব্র যুদ্ধে অবতীর্ণ। গত ১৭ দিনে যেসব খন্ডযুদ্ধ হয়েছে, তাতে জনবল ও সম্পদের বিচারে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে গেছে। রাজাকারদের অস্ত্রসহ শটকে পড়ার সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের নিজেদের ট্যাংক, ভারি কামান ও বিমান সমর্থন না থাকার ফলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে।

গোপন বার্তা পেয়ে হেডকোয়ার্টার থেকে সম্মুখ সমরের সৈন্যদের পিছিয়ে এনে প্রতিরোধ ঘাঁটিতে সমবেত করা হয়। কিন্তু অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে রাতের অন্ধকারেই প্রাণভয়ে পালিয়ে যায় যশোর ক্যান্টনমেন্টের পাকিস্তানি সৈন্যরা।

১৯৭১ সালের এই দিনে যশোরের কেশবপুর হানাদারমুক্ত হয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামসরা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজয় বরণ করে। কেশবপুরকে শত্রুমুক্ত করে মুক্তি বাহিনী রাইফেলের আগায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উঁচিয়ে কেশবপুর থানায় উত্তোলন করার মধ্য দিয়ে কেশবপুর বিজয় উদ্যাপন করে। রাজাকার, আল বদর, আল শামসরা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এই বিজয় দেখে প্রাণভয়ে কেশবপুর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়। একের পর এক জায়গা শত্রুমুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধারা বীরবলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। আজকের এই দিনে জামালপুর, ময়মনসিংহ, মধুপুরও শত্রু মুক্ত হয়।

একাত্তরের এদিনে ভারতীয় বেতার কেন্দ্রের আকাশবাণী থেকে রাত ১০টায় হিন্দি, উর্দু ও পশতু ভাষায় জেনারেল মানেকশ বাংলাদেশে দখলদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘তোমাদের বাঁচার কোনো পথ নেই। মুক্তি বাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশকে মুক্ত করার জন্য তোমাদের ঘিরে রেখেছে। তোমরা যে নিষ্ঠুর আচরণ করেছ, তারা তার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। অনেক দেরি হওয়ার আগেই তোমরা আত্মসমর্পণ কর।’

আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র বাংলা সংবাদ বুলেটিনের পাশাপাশি কয়েক দফায় মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি নিয়ে সংবাদ প্রচার করে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকেও সকাল-সন্ধ্যায় অতিরিক্ত সময়ে প্রচার করা হয় যুদ্ধ সমীক্ষা, দেশাত্মবোধক গান ও চরমপত্র।

পাকিস্তানের জেনারেল নিয়াজি সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ‘দুর্গ’ যশোরের পতন ঘটে আজ। মুক্ত হয় দেশের পশ্চিমাঞ্চল। যশোর পতন পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের মূল কেন্দ্রকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। গভর্নর আবদুল মালেক পূর্বাঞ্চলের সৈন্যাধ্যক্ষ লেফটেনেন্ট জেনারেল নিয়াজির অভিমত উদ্ধৃত করে এক দুর্গত বার্তায় ইয়াহিয়াকে জানান, যশোরের বিপর্যয়ের ফলে প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলের পতন প্রায় সম্পন্ন এবং মেঘনার পূর্ব দিকের পতনও কেবল সময়ের প্রশ্ন। এই অবস্থায় ‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যদি প্রতিশ্রুত বৈদেশিক সামরিক সহায়তা না পৌঁছায়’ তবে জীবন রক্ষার জন্য বরং ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে আলোচনা শুরু করা বাঞ্ছনীয়। তড়িঘড়ি সে সন্ধ্যায় মালেকের দুর্গত বার্তা পৌঁছে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে অর্থনৈতিক সাহায্যদান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ রাতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, উভয় পক্ষের সৈন্য প্রত্যাহার ও শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের জন্য এক প্রস্তাব ১০৪-১১ ভোটে গ্রহণ করে। কেবল সে প্রস্তাবের বিপক্ষে অটুট থাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন, সমাজতন্ত্রী কয়েকটি দেশ, ভারত ও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানকারী দ্বিতীয় দেশ ভুটান।

"