মাদকাসক্ত বাবার হাতে শিশুসন্তান ‘খুন’!

৬ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা লাশ উদ্ধার, বাবা আটক

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার বাংলামোটরে এক সন্তানের লাশসহ অন্য সন্তানের গলায় দা ধরে বাড়ির ভেতরে আছেন বাবা, এমন তথ্যে বাড়ির সামনেই অবস্থান নেয় পুলিশ, র‌্যাব ও ফায়ার সার্ভিস। গতকাল বুধবার সকাল ৮টা থেকে বাড়িটি ঘিরে রাখা হয়। পরে দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে ছয় ঘণ্টার কৌশলে বের করে আনা হয় বাবা নুরুজ্জামান কাজল ও বড় ছেলে সুরাইতকে (সাড়ে তিন বছর)। আর উদ্ধার করা হয় কাফনে মোড়ানো ছোট ছেলে সাফায়েতের (আড়াই বছর) লাশ। পরে নুরুজ্জামানকে আটক করে পুলিশ। সাফায়েতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে। সুরাইতকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। এর আগে সকাল থেকে ছোট ছেলেকে হত্যার পর বড় ছেলেকে জিম্মি করে নুরুজ্জামান কাজল বাড়ির মধ্যে অবস্থান করছেনÑএমন কথা শোনা গেলেও হত্যাকা-ের সত্যতা পাওয়া যায়নি। বাংলামোটরের লিংক রোডে ১৬ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা নুরুজ্জামানের স্বজনরা জানান, নুরুজ্জামান ও তার দুই ছেলে থাকত। তিন-চার মাস আগে স্ত্রীকে বের করে দেয় নুরুজ্জামান। এরপর থেকে বাড়িতে দুই সন্তান ও নুরুজ্জামান ছাড়া আর কেউ থাকত না। কয়েক দিন ধরে জন্ডিসে আক্রান্ত ছিল ছোট ছেলে সাফায়েত। স্বজনদের ধারণা, জন্ডিসের কারণে বুধবার সকালে সাফায়েত মারা গেছে।

নুরুজ্জামানের মা আমেনা বেগম বলেন, ‘সকালে আমার ছেলে ফোন করে বলল, তোমার নাতি নাই। আমার নাতির জন্ডিস হইছিল। ডাক্তারও দেখাইছে। আমার ছেলে ওরে মারে নাই। আপনারা ভুল বলছেন।’ এদিকে সাফায়েতের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, তাও তাৎক্ষণিক জানাতে পারেনি পুলিশ।

ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার জানান, ‘বাড়ির ভেতরে সবকিছু ভাঙাচোরা, এলোমেলো। এগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে না কীভাবে মারা গেছে। পোস্টমর্টেম না করে কিছু বলা যাচ্ছে না। কোনো রক্তের দাগও পাওয়া যায়নি। যে শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, তার বাবাকে আটক করা হয়েছে। প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আমরা কাউকে দোষারোপ করতে চাই না।

নুরুজ্জামান কাজলের স্বজনদের দাবি, পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে নুরুজ্জামান কাজল তৃতীয়। বাবা মনু মিয়া। এই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা তারা। বাবা মারা গেছেন আগেই। নুরুজ্জামান নিজে টাইলসের ব্যবসা করলে চার বছর আগে লস করায় বন্ধ হয়ে যায়। পারিবারিক কলহ ও বাজে ব্যবহার করে পরিবারের অন্য সদস্যদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিন মাস আগে স্ত্রীকে নির্যাতন করে তাড়িয়ে দেয় নুরুজ্জামান। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল। অন্যদের সঙ্গে বাজে আচরণ করলেও সন্তানদের নুরুজ্জামান আগলে রাখতেন বলে জানান প্রতিবেশীরা।

টাইলস ব্যবসায়ী রাশেদুর রহমান সুমন বলেন, ‘দু-তিন মাস ধরে দুই ছেলেকে নিয়ে একাই বাসায় থাকতেন নুরুজ্জামান। কাউকে বাসায় যেতে দিতেন না। শুনেছি মাদক গ্রহণ করতেন। কিন্তু আমি নিজে কখনো মাদক নিতে দেখিনি। কেন এমনটি করলেন তা বুঝতে পারছি না। তবে মাথায় একটু সমস্যা ছিল তার।’

এদিকে গতকাল সকালে নুরুজ্জামান নিজেই মসজিদে গিয়ে ছেলে মৃত্যুর সংবাদ মাইকে প্রচার করেন। এরপর আজিমপুর কবরস্থানে মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করে আসেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন কাফনের কাপড়। এরপর পাশের মসজিদের এক ইমামকে নিয়ে বাসায় যান। এরপর থেকে ইমাম, মৃতসন্তানসহ দুই ছেলেকে নিয়ে ভেতরেই অবস্থান করছিলেন নুরুজ্জামান। এরই মধ্যে পুলিশ ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে ক্ষিপ্ত হন নুরুজ্জামান।

শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, ‘আমাদের দেখে বলেন, আপনারা কেন আসছেন, কাউকে লাগবে না। আপনারা চলে যান।’

ঘটনার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে চলে আসেন র‌্যাবের সদস্যরা। এরপর থেকে সতর্কতার সঙ্গে বাইরে অবস্থান নেয় পুলিশ। রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার জানান, খবর পেয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে আসি। ভেতরে ছোট একটা শিশু ছিল, মসজিদের একজন হুজুর ছিলেন। তাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমরা কোনো ধরনের অ্যাকশনে যাইনি। কারণ, এতে ক্যাজুয়ালিটির শঙ্কা ছিল। আমরা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছি। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে জীবিতদের সুস্থভাবে উদ্ধারের চেষ্টা করেছি। দুপুরের নামাজের পর শিশুর জানাজার কথা বলে তাকে বাইরে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়। এতে কাজ হলো। সে বেরিয়ে এলো। সঙ্গে সঙ্গে আমরা আড়াল থেকে তাকে ধরে ফেলি। সমস্যা ছাড়াই ছয় ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযান শেষ হয়।

এদিকে ঢাকা মেডিকেল সূত্র জানায়, দুপুর সোয়া ২টায় নিহত শিশু সাফায়েতের লাশ মর্গে আনা হয়। সেখানে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে পুলিশ। শাহবাগ থানার এসআই চম্পক চক্রবর্তী বলেন, এসআই চম্পক চক্রবর্তী সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, সাফায়াতের কপালের বাম পাশে দুটি কালো জখম, থুতনির নিচে কালো জখম ও দুই ঠোঁটে কালো জখমের চিহ্ন আছে। তবে ময়নাতদন্তের পর তার মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। এদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘শিশু সাফায়াতের ময়নাতদন্ত হবে আগামীকাল (বৃহস্পতিবার)।’

ঢামেক মর্গের সামনে মৃত সাফায়েতের চাচা নুরুল হুদা উজ্জ্বল ও ফুফু জাহানার বেগম জানান, তাদের ভাই নুরুজ্জামান কাজল তার ছেলেকে হত্যা করেছেন, এটা হতে পারে না। তাদের বিশ্বাস অসুস্থ হয়ে মারা গেছে সাফায়েত। তারা আরো জানান, নুরুজ্জামানের স্ত্রী প্রিয়া আক্তার মালিহা তিন মাস আগে কামরাঙ্গীরচরে বাবার বাড়িতে চলে গেছে। এরপর থেকে নুরুজ্জামানই দুই ছেলেকে দেখাশোনা করছিলেন।

 

"