রাজশাহী

৪ এমপির সম্পদ বেড়েছে : কমেছে এনামুলের

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী

রাজশাহীর বর্তমান ছয় এমপির মধ্যে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া চারজনেরই বার্ষিক আয় ও সম্পদ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। কোনো এমপির আয় ও সম্পদ বেড়েছে কয়েক গুণ পর্যন্ত। কিন্তু আয় কমে গেছে রাজশাহী-৪ (বাগামারা) আসনের এমপি এনামুল হকের। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের দেওয়া হলফনামা ও বিগত ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে দেওয়া হলফনামা সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) : এ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী তৃতীয়বারের মতো সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এর আগে দুইবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে একবার বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। এরপর গত ৫ বছরে তার আয় এবং সম্পদ বেড়েছে কয়েক গুণ। তার বর্তমান বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে, ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। গত বার নির্বাচনের আগে যেটি ছিল ২০ লাখ ৬৪ হাজার ৮২৭ টাকা। কিন্তু ২০০৮ সালে তার বার্ষিক আয় ছিল ৮৮ লাখ ৫২ হাজার ৯২৪ টাকা। সেই হিসাবে ২০০৮ সালের

পরের পাঁচ বছরে তাঁর আয় কমলেও গত পাঁচ বছরে আবার দ্বিগুণ হয়েছে। বেড়েছে সম্পদের পরিমাণও। এই পাঁচ বছরে তিনি বহুতল অ্যাপার্টম্যান্টসহ আরো সম্পদের মালিক হয়েছেন। বিগত পাঁচ বছরে এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর সম্পদের বহরে ৬৩ লাখ টাকা মূল্যের একটি প্রাইভেট কারও যোগ হয়েছে। আর তার আগের পাঁচ বছরে যোগ হয়েছিল একটি শুল্কমুক্ত ৬১ লাখ টাকা দামের জিপ গাড়ি।

এমপি ফারুক চৌধুরীর ওপর নির্ভরশীলদের বর্তমান বার্ষিক আয় হলো দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। গত ২০১৪ সালের নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামায় যা ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। পাঁচ বছর আগে ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। তার নগদ টাকার পরিমাণ হলো ৯০ লাখ ৯৫ হাজার ৬০২ টাকা। স্ত্রীর নগদ টাকার পরিমাণ রয়েছে ৩০ লাখ ৯৭ হাজার ১৪০ টাকা। তবে ব্যাংকে দুজনেরই টাকা জমা নেই বলে দেখানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য জানার জন্য এমপি ফারুক চৌধুরীর মোবাইল ফোনে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি ফোন রিসিভি করেননি।

রাজশাহী-২ (মহানগর) : এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। তার সম্পদ এবং আয় দুইটিই বেড়েছে। তিনি এবার তৃতীয়বারের মতো মহজোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এর আগে দুইবার এমপি হয়েছেন। এর মধ্যে গতবার বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। ফজলে হোসেন বাদশা এবার বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৭ লাখ ৫০০ টাকা। এর আগে ২০১৪ সালের নির্বাচনে তার দেখানো হয়েছিল ৬ লাখ ২৪ হাজার ৭৭২ টাকা। ২০০৮ সালে তার বার্ষিক আয় ছিল ২ লাখ ২ হাজার টাকা। গত পাঁচ বছরে ফজলে হোসেন বাদশার সম্পদের পরিমাণও বেড়েছে। নগরীর হড়গ্রামে মার্কেটসহ একটি প্রাইভেট কার যোগ হয়েছে তার সম্পদের ঝুলিতে। তার নগদ টাকার পরিমাণ ১৫ লাখ ১৮ হাজার ৬৮৬ টাকা। ব্যাংকে জমা রয়েছে ২৫ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।

রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) : এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিনের আয়ও বেড়েছে। নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত হলফনামায় তার বর্তমান বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৩১ লাখ ৮৫ হাজার ৬০৫ টাকা। এর মধ্যে কৃষি থেকে তার আয় দেখানো হয়েছে ১১ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং মৎস্য চাষ থেকে আয় দেখানো হয়েছে ২০ লাখ টাকা। ব্যাংকে জমা রয়েছে ৪৩ লাখ ৮২ হাজার ৯২২ টাকা এবং নগদ রয়েছে ৩ লাখ টাকা। এছাড়াও গাড়ির ঘরে দেখানো হয়েছে ৫০ লাখ ৭৫ হাজার ৮৭৫ টাকা। কিন্তু কি গাড়ি তা উল্লেখ করা হয়নি। অথচ পাঁচ বছর আগে তাঁর বার্ষিক আয় ছিল মাত্র ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে কৃষি চাষ থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং ব্যবসা থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা আয় ছিল।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এমপি আয়েন উদ্দিন বলেন বলেন, ‘সংসদ সদস্য হিসেবে সরকারি যে অর্থ প্রতি বছর পেয়েছি তাতে আয় বৃদ্ধি হয়েছে। এছাড়াও কৃষি ও মৎস্য চাষেও আয় বেড়েছে। যে কারণে সম্পদের পরিমাণও বেড়েছে।’

রাজশাহী-৪ (বাগমারা) : এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক। রাজনৈতিক পরিচয়ে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজশাহীর সবেচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি তিনি। এবার দিয়ে তৃতীয়বারের মতো তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে একবার বিনাভোটে একবার ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। গত ১০ বছরে তার ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়াতে দৃশ্যমান কার্যক্রম অনেক। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমপি এনামুলের ‘এনা প্রপার্টিজ’ কাজও করছেন অনেক। বেড়েছে বাড়ি গাড়িসহ বেশকিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত হলফনামায় তার বার্ষিক আয় এবার কমে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৪৯ লাখ টাকা। কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনে ছিল কাটায় কাটায় অর্ধ কোটি টাকা। আবার ২০০৮ সালের নির্বাচনে ছিল ২০ লাখ টাকা। বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট বাড়লেও কৌশলে টাকার পরিমাণ দিয়ে সেটি উল্লেখ করা হয়। ২০০৮ সালে তার মোট কৃষি জমির মূল্য ছিল ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ২০১৪ সালে গিয়ে হয় ১ কোটি ৫৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এবার কৃষি জমির মূল্যের পরিমাণও কম দেখিয়ে উল্লেখ করা হয় ১ কোটি ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৯১৯ টাকা। এ প্রসঙ্গে জানার জন্য এমপি এনামুল হকের মোবাইলে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) : এ আসনের বর্তমান এমপি কাজী আবদুল ওয়াদুদ দারা। তবে তিনি গত ১০ বছরে এলাকায় ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হয়ে পড়ায় এবার দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। ফলে গত দুইবারের এমপি দারার সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে না কি কমেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ আসনে এবার আওয়ামী লীগ নতুন প্রার্থী দিয়েছে।

রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) : এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মো. শাহরিয়ার আলম। তিনি বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন থেকেই সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আসন্ন সংসদ নির্বাচনেও তাকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন আওয়ামী লীগ। আসন্ন নির্বাচনী হলফনামায় শাহরিয়ার আলমের বর্তমান বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৪৪ লাখ ৬৫ হাজার ৮০৮ টাকা। তার বার্ষিক ব্যয় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। তবে গত নির্বাচনে তার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছিল ১ কোটি ১৫ লাখ ১৩ হাজার ১৮০ টাকা। তার আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনের হলফনামায় বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছিল ৯৭ লাখ ৭৩ হাজার ৯৪৯ টাকা। তার ওপর নির্ভরশীলদেরও আয় বেড়েছে। সেই হিসেবে বছরে প্রায় আড়াই কোটি টাকা আয় বেড়েছে এমপি শাহরিয়ার আলমের। এমপি শাহরিয়ারের ১৫ লাখ টাকা দামের একটি গাড়ি ছিল। বর্তমানে রয়েছে ৭৬ লাখ টাকার বেশি দামের একটি গাড়ি। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ৬০ লাখ ৭৫ হাজার মূল্যের অ্যাপার্টম্যান্ট। তবে ওই নির্বাচনের আগে ব্যবসার ক্ষেত্রে তার বার্ষিক লোকসানের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল ২৪ লাখ ৯২ হাজার ৫২৪ টাকা। অথচ তার এই খাত থেকে পাঁচ বছর আগে আয় হতো ৮ লাখ ৯০ হাজার ৪২১ টাকা।

 

"