ফিরে আসে বিজয়

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

বিশেষ প্রতিনিধি

আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রণাঙ্গন। সম্মিলিত মিত্রবাহিনীর আক্রমণে দিশাহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী। সূর্য ওঠার আগেই পালাতে থাকে বিভিন্ন সীমান্ত ঘাঁটি থেকে। স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ভারত। লোকসভায় দাঁড়িয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার পর স্থায়ী মন্ত্রিসভার বৈঠকে ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু ভাবাবেগে পরিচালিত হয়ে নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে বিচার করেই স্বীকৃতি দিচ্ছি।’ তার বক্তব্য শেষ না হতেই হর্ষধ্বনি আর ‘জয় বাংলাদেশ’ ধ্বনিতে ফেটে পড়েন ভারতের সংসদ সদস্যরা।

আজ ৬ ডিসেম্বর। মিত্রবাহিনী আকাশ থেকে অবাধ গতিতে বিমান আক্রমণ চালায়। বঙ্গোপসাগরে ভারতের নৌবাহিনী সৃষ্টি করে নৌ-অবরোধ। দশম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট ও সাবসেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা কর্নেল জাফর ইমামের নেতৃত্বে ফেনী মুক্ত হয়।

মেজর জলিলের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধারা সাতক্ষীরা মুক্ত করে খুলনার দিকে এগোতে থাকে। ঝিনাইগাতীর আহম্মদনগর হানাদার বাহিনীর ঘাঁটি আক্রমণ করেন কোম্পানি কমান্ডার মো. রহমতুল্লাহ। তারা পৌঁছার আগেই ঘাঁটি ছেড়ে চলে যায় পাকিস্তান বাহিনী। ভোরবেলায় আহম্মদনগর ক্যাম্প রেড করে শেরপুর সদরে আসার পথে আলবদর কমান্ডার কামারুজ্জামানের বাড়ি ঘেরাও করেন মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু তাকে ধরা যায়নি। তারা জানতে পারলেন সে আগের রাতে আহম্মদনগর ক্যাম্পের পাকিস্তান বাহিনীদের সঙ্গে জামালপুরে চলে গেছে। সকাল ৭টায় শেরপুর শহরে পৌঁছায় দলটি। কিছুক্ষণের মধ্যেই হেলিকপ্টার আসে। পদার্পণ করেন মিত্রবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আরোরা। রহমতুল্লাহর বাহিনীসহ হাজার হাজার মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিপাগল মানুষ তাকে অভ্যর্থনা জানায়। মুহূর্তেই আদেশ হলো এ দিন বিকেল ৫টায় জামালপুর আক্রমণের। জামালপুর এম্বোসের জন্য রহমতুল্লাহ তার বাহিনীকে নান্দিনায় ডিফেন্স দেওয়া হলোÑযাতে হানাদার বাহিনী রেলওয়েযোগে পালাতে না পারে। পরে জামালপুর মুক্ত হয়।

পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও মুক্ত করে বীরগঞ্জ ও খানসামার পাকিস্তানের অবস্থানের দিকে এগিয়ে চলে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী। লাকসাম, আখাউড়া, চৌদ্দগ্রাম ও হিলিতে মুক্তিবাহিনী দৃঢ় অবস্থান নেয়। রাতে যৌথবাহিনীর অধিকারে আসে আখাউড়া ও সিলেটের শমসেরনগর। আর মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ আক্রমণে যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে পালিয়ে যায় পাকিস্তান বাহিনী। ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করে তারা খুলনার শিরোমনিতে অবস্থান নেয়। মুক্ত হয় যশোর। যৌথবাহিনী পায়ে হেঁটে ঝিনাইদহ পৌঁছে এবং শহরটি মুক্ত করে। প্রথম কোনো জেলা শহর হিসেবে যশোরই প্রথম হানাদারমুক্ত হয়।

এই দিনে শত্রুমুক্ত হয় কুড়িগ্রাম। ৮টি থানা নিয়ে সে সময় কুড়িগ্রাম একটি মহকুমা ছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধারা তীব্র আক্রমণ চালিয়ে পরাস্ত করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে। এর আগে এই অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় বাহিনীর ষষ্ঠ মাউন্টেন ডিভিশনের সহায়তায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওপর তীব্র আক্রমণ চালিয়ে ১৪ নভেম্বর ভুরুঙ্গামারী, ২৮ নভেম্বর নাগেশ্বরী ও ৩০ নভেম্বর উত্তর ধরলা মুক্ত করে। মুক্তিবাহিনী ১ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম শহরের চারপাশে অবস্থান নেয়। ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর নিয়মিত আক্রমণ চালাতে থাকে। অবশেষে এ দিন বিকেলের দিকে শত্রুমুক্ত হয় কুড়িগ্রাম।

এ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখার জন্য শহীদ লেফটন্যান্ট আশফাকুস সামাদ বীর উত্তম (মরণোত্তর) খেতাব পান। বীরবিক্রম খেতাব অর্জন করেন শওকত আলী এবং সৈয়দ মনসুর আলী টুংকু। বীরপ্রতীক খেতাব পান বদরুজ্জামান, আবদুল হাই সরকার, আবদুল আজীজ এবং তারামন বিবি।

স্বীকৃতি পেয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম মিত্ররাষ্ট্র ভারতের জওয়ানদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘ভারতের সৈন্যবাহিনীর জওয়ানরা আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলাদেশের মাটি থেকে হানাদার শত্রুদের নির্মূল করার জন্য আজ যুদ্ধ করে চলেছে।’ কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় বিশেষ সম্পাদকীয়। তাতে লেখা হয় ‘স্বীকৃতির তিলক বাংলাদেশের ললাটে। বাংলাদেশের আজ বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। সূর্যোদয়কে যাহারা অস্বীকার করে, তাহারা অন্ধ মাত্র, অস্বীকৃতির দৃষ্টিহীনতা সকালের রশ্মিজলকে মিথ্যা করিয়া দিতে পারে না।’

বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ায় ভারতের সঙ্গে তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে পাকিস্তান। আর ভারতে মার্কিন অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যায়। উত্তর ভিয়েতনামে যুদ্ধরত দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু রণাঙ্গন থেকে ততক্ষণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পালাতে শুরু করেছে।

 

"