একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

শিগগির জোটপ্রার্থী ঘোষণা

আ.লীগের চূড়ান্ত তালিকা দু-এক দিনের মধ্যেই

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ৯ ডিসেম্বর। পরদিন প্রতীক পাবেন প্রার্থীরা। শুরু হবে প্রচারযুদ্ধ। অথচ এখনো চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেনি আ.লীগ ও বিএনপি। দুই দলই চাচ্ছে শেষ মুহূর্তে ঘোষণা দিতে। কেননা, যাচাই-বাছাই, বিদ্রোহী প্রার্থী এবং অনেক সমীকরণ এখনো বাকি। তা ছাড়া রয়েছে জোটগত টানাপড়েনও

 

আওয়ামী লীগ এরই মধ্যেই ২৩০ আসনে দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দিয়েছে। কোনো কোনো আসনে দুইজন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করলেও নানা হিসাব-নিকাশ শেষে একক প্রার্থীও ঠিক করে রেখেছে। ১৪ দলীয় জোটের শরিক এবং জাতীয় পার্টি ও বিকল্পধারাসহ অন্য মিত্রদলগুলোকে কতটি আসন দেওয়া হবে এবং সেসব আসনে কারা প্রার্থী হবেন তাও প্রস্তুত করে রেখেছে দলটি। এখন অপেক্ষা করছে নির্বাচন কমিশনের মনোয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হওয়া প্রার্থীদের আপিল নিষ্পত্তি এবং মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনের। এরপরই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করবে ক্ষমতাসীনরা ও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবে।

ফলে সবার নজর এখন চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকার দিকেই। আওয়ামী লীগ নিজেদের জন্য কয়টি আসন রাখছে, মহাজোটের শরিকদের কয়টি আসন দিচ্ছে, কোন আসনে দলের ও জোটের কে প্রার্থী হচ্ছেন তা জানতে উদগ্রীব সবাই। দলের বাইরে সেদিকে তাকিয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিও। কেননা ক্ষমতাসীনদের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর অন্তত ১০০ আসনে প্রার্থী রদবদলের চিন্তা করছে দলটি।

এ ব্যাপারে গত সোমবার দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, দু-একদিনের মধ্যে আমাদের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে পারব। তারপর তারপর জোটগতভাবে আমাদের প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। এমনকি আসন বণ্টন নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে কোনো ধরনের অবিশ্বাস বা দূরত্ব তৈরি হয়নি বলেও জানান এই নেতা। তিনি বলেন, জোটের মধ্যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এ জোটের মধ্যে অবিশ্বাসের কোনো জায়গা নেই। আর কোনো ধরনের টানাপড়েনও নেই।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ৯ ডিসেম্বরের আগেই দল ও জোটের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। বেশ কিছু আসনে আওয়ামী লীগ দুইজন করে প্রার্থী দিয়েছে। মনোনয়ন না পেয়ে অনেক আসনে দলের বিদ্রোহীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। এর মধ্যে জোট শরিকদের আসনেও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। এদের প্রত্যাহার করে দল ও জোটের একক প্রার্থী নিশ্চিত করেই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। সে হিসাবে ৮ ডিসেম্বর প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হতে পারে। তবে তা প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনার ওপর নির্ভর করছে বলে জানান দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা।

তবে শেষ পর্যন্ত জোটের শরিক ও মিত্র দলগুলো ঠিক কতটি আসন পাচ্ছে বা কীসের ভিত্তিতে আসন সমঝোতা হয়েছে তা এখনো জানে না দলগুলো। এমনকি কীসের ভিত্তিতে আসন সমঝোতা তাও স্পষ্ট করা হয়নি। দলীয় সূত্র মতে, জোটের সব দলকে চূড়ান্ত আসন সমঝোতার বিষয়টি এখনো জানাননি ক্ষমতাসীনরা। তবে এবার সব রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে বিএনপি আঁটসাঁট বেঁধে নির্বাচনে নামায় মহাজোট শরিকদের অল্পতেই তুষ্ট থাকতে হবে বলেও ধারণা দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

সেক্ষেত্রে জোট শরিক ও জাতীয় পার্টিসহ অন্য মিত্র দলগুলো কতটি আসন পাচ্ছে; জানতে চাইলে দলের নীতিনির্ধারকরা বলেন, শেষ মুহূর্তে মহাজোট শরিকদের জন্য ৫০ থেকে ৫৫টির মতো আসন ছাড়তে পারে আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টিকে (জাপা) ৩৫ থেকে ৪০টি আসন ছাড় দেওয়া হতে পারে। আবার এই সংখ্যা ৩৫ এর নিচেও নামতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত জাতীয় পার্টির জন্য ২৩টি আসন ফাঁকা রাখা হয়েছে। এসব আসনে আওয়ামী লীগ কোনো প্রার্থী দেয়নি। আর যেসব আসন জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হবে সেগুলো থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীও প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।

এর বাইরে ১৪ দলের অন্য শরিকদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টিকে পাঁচটি, জাসদকে দুইটি, বাংলাদেশ জাসদকে দুইটি, জাতীয় পার্টিকে (জেপি) একটি এবং তরিকত ফেডারেশনকে দুইটি আসন দেওয়া হতে পারে। জাসদ এবং ওয়ার্কার্স পার্টির আসন কমতেও পারে। ১৪ দলের বাইরে বিকল্পধারাকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে তিনটি আসন। এমন তথ্য জানান দলের নেতারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা বলেন, এবার নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। তাই নির্বাচনে জেতার মতো প্রার্থীদেরই জোটের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। জোট শরিকদের যারা ‘নৌকা’ নিয়ে নির্বাচন করবেন, এরই মধ্যে তাদের চিঠিও দিয়েছেন তিনি।

জাতীয় পার্টির ব্যাপারে নেতারা বলেন, আগে থেকেই আসন ঘোষণা করলে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে জাতীয় পার্টি। বিশেষ করে মনঃপূত না হলে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ নানা ধরনের নাটক করতে পারেন। এমনকি জোট ছাড়ার মতো ঘটনা ঘটানোও তার পক্ষে অসম্ভব নয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এরশাদ নানা নাটকের জন্ম দিয়েছিলেন বলেই এমন সন্দেহ রয়েছে আওয়ামী লীগে। এ কারণে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পরও জাতীয় পার্টি কয়টি আসনে ছাড় পাচ্ছে তা নিশ্চিত হতে পারেননি দলের নেতারা। এটি জানতে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন অর্থাৎ ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় পার্টিকে অপেক্ষা করতে হতে পারে।

এ ব্যাপারে জাতীয় পার্টি নেতাদের অভিমত, শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ যে কয়টা আসন দেবে, মনঃপূত না হলেও মেনে নেওয়া ছাড়া তখন আর কোনো উপায় থাকবে না।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের একাধিক সদস্য জানান, ২৩ আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী দেয়নি। এই আসনগুলো জাতীয় পার্টির পেতে কোনো বাধা নেই। ৯ ডিসেম্বরের আগেই আওয়ামী লীগ তাদের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের সরিয়ে নেবে। এছাড়া মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন আরো ১৩-১৪টি আসন থেকে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়ে জাতীয় পার্টিকে দিয়ে দেবে। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩৫ থেকে ৩৮টি আসন আওয়ামী লীগের কাছ থেকে পেতে পারে জাতীয় পার্টি। এর মধ্যেও কয়েকটি আসন আবার উন্মুক্ত রেখে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ওইসব আসনে জাতীয় পার্টি, ১৪ দলের শরিক ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা থাকবে।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, জোটগত ও দলগত প্রার্থী মোটামুটি চূড়ান্ত হয়ে আছে। তালিকা না দিলেও মৌখিকভাবে বলা হয়েছে। কিছু কিছু আসনে প্রত্যাহারের শেষ দিনেও হয়তো দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে থাকতে চাইবে। তাদের ব্যাপারে দলের কঠোর বার্তা দিয়েছেন দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। আমরা প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করব। আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি, করব। তবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনের পর আর নরম থাকার সুযোগ নেই। আমরা আগেও বলেছি বিদ্রোহী হলে দল থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হবে।

 

"