জলবায়ু পরিবর্তন : সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সতর্কবাণী

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

বিবিসি বাংলা

পোল্যান্ডের কাটোভিচ শহরে গত সোমবার শুরু হয়েছে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন যাতে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হচ্ছে যে জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন মানবসভ্যতার প্রতি বিশ্বের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বাংলাদেশ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সর্বোচ্চ ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর একটি।

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান প্রভাব হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় লবণাক্ততা বৃদ্ধি। অঞ্চলে কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই লবণাক্ততা বাড়ছে এবং তাতে এখানকার কৃষিতে গভীর ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন হচ্ছে। কাটোভিচ থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. সালিমুল হক বলেন, অনেকে লোনা পানির কারণে বাধ্য হচ্ছে কৃষিতে পরিবর্তন আনতে।

তিনি বলছেন, ওই এলাকাগুলোতে এখন লোকেরা লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে এমন প্রজাতির ধান চাষ করছে, অনেকে ধান ছেড়ে চিংড়ি চাষ করছে, কোথাও বা বৃষ্টির পানি ধরে রাখা হচ্ছে।

তার কথায়, পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেবার অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অ্যাডাপটেশনের একটা সীমা আছে। লোনা পানি আরো বেড়ে গেলে ওখানে আর লোক বাস করতে পারবে না।’

ভোলার চরফ্যাশনের কৃষক মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, ‘এই এলাকায় ফাল্গুন-চৈত্র মাস থেকেই লোনা পানি ঢুকতে থাকে। বিশেষ করে যেসব জায়গায় বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে সেই এলাকাগুলোয় লবণাক্ততা বড় সমস্যা’। তার মতে ঢালচর, চর কুকরিমুকরি, চর মাদ্রাজ, আসলামপুরÑ এ রকম কয়েকটি ইউনিয়নে এ সমস্যা বেশি। গত চার-পাঁচ বছরে এ সমস্যা বেড়েছে বলেও জানান তিনি।

লবণাক্ততার কারণে কীভাবে এলাকাগুলোতে কৃষির ধরন পাল্টে যাচ্ছেÑ এমন প্রশ্নে পটুয়াখালী জেলার সরকারি কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘কলাপাড়া ও আমতলী উপজেলায় আগে যেখানে ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখের পর লোনা পানি ঢুকত, এখন জানুয়ারির ১৫ তারিখের পর থেকেই আন্ধারমানিক নদীর খালগুলোতে লোনা পানি ঢুকতে থাকে।’

তিনি বলেন, একসময় ৭০-৮০ এর দশকে এই এলাকায় সরকারি কৃষি বিভাগের ৮০০-এর বেশি পাম্প কাজ করত, কিন্তু এখন কাজ করে মাত্র ৬০-৭০টি। এতেই বোঝা যায়, কীভাবে বোরো চাষ ছেড়ে দিচ্ছেন চাষিরা। অনেকে ওই সময়টায় ধানের পরিবর্তে তরমুজ চাষ করছেন।

সরকারের কৃষি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মি. ভূঁইয়ার মতে, বৃষ্টিপাতের সময়ও বদলে যাচ্ছে। আগের মতো আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বর্ষাকাল শুরু হচ্ছে না। বৃষ্টি হচ্ছে ভাদ্র মাস নাগাদ।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া এখন একেবারে বাস্তব, সবাই চোখে দেখতে পাচ্ছেন, অনুভব করতে পারছেন। পোল্যান্ডের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হচ্ছে, ‘বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন মানবসভ্যতার প্রতি অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর আবহাওয়া চরম ভাবাপন্ন হয়ে যাবে। সেই দিন হয়তো এসে গেছে। পৃথিবীর কোথাও এখন অস্বাভাবিক গরম পড়ছে, কোথাও অস্বাভাবিক ঠান্ডা পড়ছে, কোথাও বন্যা, কোথাও বছরের পর বছর ধরে খরা হচ্ছে, কোথাও আবার ঘন ঘন দাবানল সৃষ্টি হচ্ছে। নিয়মিত সংবাদ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে এসব খবর।’

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, ২০১৫ থেকে প্রতি বছরই পৃথিবীর উষ্ণতম বছরের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে ফসলের প্যাটার্ন বদলে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে এভাবে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ পৃথিবীর তাপমাত্রা তিন-পাঁচ ডিগ্রি বেড়ে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেল আইপিসিসি বলছে, এখনই যদি পৃথিবীর দেশগুলো এ নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়Ñ তাহলে পৃথিবীতে দুর্যোগ নেমে আসবে, সমুদ্রে পানির স্তর বেড়ে যাবে, সমুদ্রে পানির তাপমাত্রা এবং অমøতা বেড়ে যাবে, ধান-গম-ভুট্টার মতো ফসল ফলানোর ক্ষমতা বিপন্ন হয়ে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা এমনভাবে বাড়ছে যে ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রির মধ্যে সীমিত রাখার যে লক্ষ্যমাত্রা ঘোষিত হয়েছিল তাতে আর কাজ হচ্ছে না।

 

"