অরিত্রীর আত্মহত্যা

বিক্ষুব্ধ ভিকারুননিসা

প্রধান শিক্ষিকা বরখাস্ত * দুই তদন্ত কমিটি গঠন * পরীক্ষা বর্জন

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিক্ষকের আচরণে অপমানিত হয়ে ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। শিক্ষার্থীরা গতকাল মঙ্গলবার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। গতকাল মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ওই ক্যাম্পাসে গেলে তিনি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নানা প্রশ্নের মুখে পড়েন। তিনি এ সময় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন এবং ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠনের কথা জানান। এ ছাড়া স্কুল কর্তৃপক্ষও আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে জানা গেছে। এদিকে, আত্মহত্যার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস।

ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনাকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলে মন্তব্য করে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী কতটা অপমানিত হলে, কতটা কষ্ট পেলে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেয়? ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘জনপ্রিয়তার কারণে এই স্কুল কর্তৃপক্ষের নানা অনিয়মের কথা অনেক আগেই কানে এসেছে। এসব অনিয়মের কারণে টাকার বিনিময়ে ভর্তি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একসময় এখানে ভর্তির জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। যা বন্ধ করা হয়েছে।’ গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর বেইলি রোডে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে এসে এসব কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। এদিকে, ছাত্রী আত্মহত্যার ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গতকাল মঙ্গলবার সকালে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের ঢাকা আঞ্চলিক অফিসের পরিচালক মো. ইউসুফকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন।

অন্যদিকে, আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষ। তাদের গঠিত কমিটির নেতৃত্ব দেবেন স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মো. আতাউর রহমান। এই কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন অভিভাবক প্রতিনিধি তিন্না খুরশীদ জাহান ও শিক্ষক ফেরদৌসী বেগম। আগামী তিন দিনের মধ্যে এই কমিটিকে প্রতিবেদনে দিতে বলা হয়েছে।

অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভাতী শাখার প্রধান শিক্ষক জিন্নাত আরাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ওই শিক্ষককে গতকাল মঙ্গলবার সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস জানান।

পা ধরে কান্না করলেও মন গলেনি অধ্যক্ষের

জানা যায়, নকলের অভিযোগে স্কুল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী (১৫) প্রিন্সিপাল নাজনীন ফেরদৌসের কাছে ক্ষমা চেয়েছিল। শুধু তাই নয়, তার পা ধরে কান্নাকাটি করেছিল অরিত্রি, যাতে তাকে টিসি না দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো কিছুতেই মন গলেনি অধ্যক্ষের।

পরিবার বলছে, অধ্যক্ষ যদি অরিত্রীকে ক্ষমা করে দিতেন, তাহলে সে আত্মহত্যা করত না। অরিত্রীর বাবা-মা জানিয়েছেন, নকলের অভিযোগ পেয়ে গত সোমবার অরিত্রীর সঙ্গে তারা স্কুলে যান। পরে তাদের ভাইস প্রিন্সিপালের কাছে নিয়ে গেলে তারা মেয়ের নকল করার ব্যাপারে ভাইস প্রিন্সিপালের কাছে ক্ষমা চান। কিন্তু ভাইস প্রিন্সিপাল কিছু করার নেই বলে তাদের প্রিন্সিপালের রুমে যেতে বলেন। সেখানে গিয়েও তারা ক্ষমা চান। কিন্তু প্রিন্সিপালও তাতে সদয় হননি। পরে তার মেয়ে প্রিন্সিপালের পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে কান্নাকাটি করলেও তাদের বেরিয়ে যেতে বলেন এবং পরের দিন টিসি নিয়ে আসতে বলেন। এ অপমান সইতে না পেরে বাসায় এসে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় অরিত্রি।

আত্মহত্যার কিছুক্ষণ আগে সে তার মাকে জানায়, ‘মা এ লজ্জা নিয়ে বাঁচতে চাই না।’ তার ছোট বোনও একই স্কুলে পড়ে। এ অপমান সইতে না পেরে বাসায় এসে অরিত্রি আত্মহত্যা করে। গত সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টায় রাজধানীর শান্তিনগরে সাত তলা ভবনের সপ্তম তলায় নিজ ফ্ল্যাটের ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় অরিত্রীকে পাওয়া যায়।

অভিভাবকদের প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘অভিভাবকরা মিছিল-টিছিল করছেন, বিষয়টা জটিল হয়ে গেল। গত সোমবার ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল নাজনীন ফেরদৌস বলেন, ওই ছাত্রী পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোনে নকল দেখে পরীক্ষা দিচ্ছিল। বিষয়টি পরিদর্শক শিক্ষক বুঝতে পেরে খাতা নিয়ে নেন। মোবাইল ফোনে পুরো বই কপি করা ছিল। তিনি আরো বলেন, গত সোমবার ছাত্রীর মা-বাবা স্কুলে এসেছিল। মেয়েকে পরীক্ষা দিতে সুযোগদানের জন্য। আমাদের স্কুলে কেউ নকল করলে তাকে আর ওই বর্ষে পরীক্ষা দেওয়ার নিয়ম নেই। আমরা তাকে পরবর্তী বর্ষের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার পরামর্শ দিই। পরে জানতে পারি অরিত্রী আত্মহত্যা করেছে। তিনি সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, নকল করার কারণে ওই শিক্ষার্থীকে টিসি দেওয়ার তথ্য সঠিক নয়।

অপরদিকে, অরিত্রী অধিকারী আত্মহত্যার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস। তিনি দেশবাসী ও ছাত্রীর বাবা-মায়ের প্রতি ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেন, এটি খুব দুঃখজনক ঘটনা, অনাকাক্সিক্ষতভাবে আমাদের একজন ছাত্রীর মৃত্যু হলো সে জন্য আমরা সবাই ক্ষমা প্রার্থী। ছাত্রীর বাবা-মায়ের কাছেও আমি ক্ষমা চাচ্ছি।

অন্যদিকে স্কুলের সামনে অভিভাবকরা সাংবাদিকদের বলেন, অচিরেই ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপালকে অপসারণ করতে হবে, বিগত ১০ বছর ধরে স্কুল কর্তৃপক্ষের কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। একটি সামান্য ভুল সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে তাচ্ছিল্যেও সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন, এমন ব্যবহার সব অভিভাবকের সঙ্গেই করে থাকেন। এখানে শিক্ষকের কাছ থেকেও ভালো আচরণ পাওয়া যায় না। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একজন বলেন, এখানে অভিভাবকের সঙ্গে চাকরের মতো ব্যবহার করা হয়। অরিত্রীর অনেক সহপাঠী স্কুলে গতকাল মঙ্গলবার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি।

অন্যদিকে, অরিত্রী অধিকারীর (১৫) আত্মহত্যার ঘটনা হাইকোর্টের নজরে আনা হয়েছে। বিষয়টিকে হৃদয়বিদারক বলে মন্তব্য করেছেন আদালত। ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে এনেছি।

‘আদালত বিষয়টিকে হৃদয়বিদারক ঘটনা বলে আবেদন আকারে আজ বুধবার রিট করতে বলেছেন। রিটে বিষয়টি তদন্ত করার আবেদন জানানো হবে।’

এদিকে, অরিত্রির মৃত্যুর সংবাদ শুনে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে ঢামেক হাসপাতালে যান ভিকারুননিসার প্রিন্সিপাল নাসরিন ফেরদৌস। সেখানে তিনি অরিত্রীর স্বজনদের তোপের মুখে পড়েন। কিছুক্ষণ পর তিনি দ্রুত হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান।

 

"