রেকর্ড মনোনয়ন বাতিল

ভোটের মাঠে লাভ-ক্ষতি

প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে এবার বাছাইয়ে বেশিসংখ্যক প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। জমা পড়া ৩০৬৫টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে নানা ত্রুটির কারণে বাদ পড়ে ৭৮৬টি। বাদ পড়ার অন্যতম কারণ প্রার্থীর খেলাপি ঋণ ও আদালতে দন্ডিত হওয়া। এছাড়া প্রার্থীদের গাফিলতিও দেখা গেছে। মনোনয়নপত্র পূরণে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র না দেওয়া, তথ্যের অসঙ্গতি, প্রার্থীর স্বাক্ষর না থাকা, প্রার্থীর স্বাক্ষরের সঙ্গে মনোনয়নপত্রে দেওয়া স্বাক্ষরের অসামঞ্জস্য, দলীয় প্রত্যয়নপত্র ছাড়া দলের নাম ব্যবহার করা, হলফনামায় তথ্য গোপন করা, সরকারি সেবার বিল খেলাপি হওয়াসহ নানা ধরনের ত্রুটি পেয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। ফলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য এখন পর্যন্ত বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়াল ২২৭৯ জন।

এবার বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন ২৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ প্রার্থী। এর আগে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা পড়া ১১০৭টি মনোনয়নের মধ্যে বাতিল হয় ২৬০টি। ১৩৮টি আপিল আবেদনের শুনানি শেষে ৪২ জনের আপিল মঞ্জুর করে ইসি। তারও আগে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা পড়ে ২৪৫৩টি। বাতিল হয় ৪৪২টি।

এবার বাতিল হওয়া মনোনয়নের মধ্যে বিএনপির প্রার্থীর সংখ্যাই বেশি। দলের চেয়ারপারসন দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দি খালেদা জিয়াসহ সারা দেশে অন্তত ৮১ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সাবেক মন্ত্রী থেকে শুরু করে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও রয়েছেন। একইভাবে ঢাকায় আওয়ামী লীগের একজনসহ সারা দেশে অন্তত ৩৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী, আওয়ামী লীগের মিত্র জাতীয় পার্টির মহাসচিবসহ দলের কয়েকজন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), গণফোরাম, বিকল্পধারা, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জাকের পার্টি, খেলাফত মজলিসসহ বেশ কয়েকটি ছোট দলের অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে।

বিশেষ করে বিএনপির বেশিসংখ্যক প্রার্থী বাদ পড়ায় মনোনয়ন বাতিল নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে রাজনীতিতে। আগামী নির্বাচনে এর কতটুকু প্রভাব পড়বে এ থেকে মাঠের ভোটের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ না বিএনপিÑ কে বেশি লাভবান হবে এমন ধাক্কা কীভাবেই বা সামাল দেবে বিএনপি এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। মনোনয়নপত্র বাতিলে যুক্তিযুক্ত কারণ থাকায় এ নিয়ে বেশ বিপাকে যেমন বিএনপি; তেমনি সরকারে থাকায় রেকর্ডসংখ্যক মনোনয়ন বাতিলের ঘটনায় কিছুটা সমালোচনার মুখেও পড়েছে আওয়ামী লীগ। তবে যুক্তিযুক্ত কারণে মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় ভোটের মাঠের যুদ্ধের নতুন কৌশল আঁটছে দুই দলই। আওয়ামী লীগ চাচ্ছে যেসব আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, সেই আসনগুলোয় নিজেদের জয় নিশ্চিত করতে। প্রয়োজনবোধে এসব আসনে প্রার্থী বদলের ঘটনাও ঘটতে পারে। আবার প্রার্থী বাদ পড়া আসনগুলোয় বিকল্প প্রার্থী দিয়ে বিএনপি ভোটযুদ্ধে নামতে চাচ্ছে। এজন্য দলটি প্রত্যেক আসনে দেওয়া একাধিক প্রার্থীর মধ্য থেকে বিকল্প প্রার্থীকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামানোর চিন্তাভাবনা করছে।

দুর্নীতি মামলায় দন্ডিত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিলের মধ্য দিয়ে ‘সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত হয়েছে’ বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ থাকারও প্রমাণ মিলেছে বলে মন্তব্য করেছেন দলের নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত উপকমিটির চেয়ারম্যান ফারুক খান।

দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপি মনোনীতদের অনেকে বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি, দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ও ঋণখেলাপি। এ কারণে তারা বৈধ প্রার্থী হননি। প্রত্যেকটি মনোনয়নপত্র রিটার্নিং অফিসার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যেগুলো বৈধ সেগুলো বৈধ ঘোষণা করেছে। আর যেগুলো বাতিলযোগ্য সেগুলো বাতিল করা হয়েছে। বাতিল কী কারণে করা হচ্ছে সেটি সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন কারণে অন্যান্য দলেরও মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এটি শুধু বিএনপির বেলায় হয়েছে যে তা নয়।

কিন্তু বিএনপি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিলের ঘটনাকে ‘সরকারের পরিকল্পনার অংশ’ বলছে। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, কেবল খালেদা জিয়া নয়, ‘বেছে বেছে’ তাদের জনপ্রিয় প্রতিনিধিদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হচ্ছে।

অবশ্য মনোনয়ন বাতিলের পেছনে বিএনপি মুখে সরকারকে দায়ী করলেও পর্যবেক্ষণে প্রার্থীদের প্রস্তুতির অভাব ও গাফিলতি ছিল বলে মনে করছে। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের বিশ্লেষণ, নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানোর পরই ক্ষমতাসীনরা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নেয় নির্বাচনকে এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিবেচেনা করে সে হিসেবেই নির্বাচনী কৌশল আঁটতে থাকে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপি প্রার্থীদের নানা খুঁত ও ফাঁকফোকর বের করার চেষ্টা করবে, সেটাই স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে দলের বিভিন্ন সভায় বারবার নেতাদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। তারপরও বিএনপির প্রার্থীরা গুরুত্ব সহকারে মনোনয়নপত্র জমা দেননি।

বাতিল হওয়া মনোনয়নপত্রগুলো পর্যবেক্ষণ করে বিএনপি নেতারা দেখেছেন, সেখানে প্রার্থীদের নানা ধরনের গাফিলতি ছিল। ঋণখেলাপি ও আদালতের দ-াদেশের কারণে যেসব মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে সেগুলো নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু অন্য মনোনয়নপত্রগুলো বাতিল হয়েছে প্রার্থীদের অবহেলার কারণে। হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকা, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের পদত্যাগপত্র জমা না দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে। এমনকি বাছাইতে বেশকিছু আসনে দলীয় প্রার্থীর মনোনয়ন ফরম পূরণে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বাক্ষরের অমিলসহ নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি ও জটিলতা দেখা গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির পক্ষে অবশ্য মনোনয়নপত্রও জমা পড়েছিল বেশি। অর্থাৎ ২৯৫টি আসনে বিএনপির ৬৯৬ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। প্রায় সব আসনে বিএনপি কৌশলগত কারণে একাধিক প্রার্থীকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েছে। কোনো কোনো আসনে দুই থেকে ৯ জন বিকল্প প্রার্থীও দেওয়া হয়। তাড়াহুড়ো করে এত প্রার্থী দেওয়ায় ভুলের পরিমাণও বেশি হয়েছে।

একইভাবে আওয়ামী লীগের যেসব স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রেও প্রার্থীদের গাফিলতি মিলেছে। আওয়ামী লীগের নেতারা জানান, আইন অনুযায়ী স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে হলে সংশ্লিষ্ট আসনের ভোটারের ১ শতাংশের স্বাক্ষর জমা দিতে হয়। আগে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে থাকলে এটি প্রয়োজন হয় না। রিটার্নিং কর্মকর্তারা দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে ১০টি করে স্বাক্ষর যাচাই করে দেখেন। স্বাক্ষর না মেলা এবং ১ শতাংশ স্বাক্ষর না থাকায় বেশির ভাগ স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।

মনোনয়ন বাতিলের ঘটনায় বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো বলে মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারক নেতারা। এই পরিস্থিতিতে কী করবে বিএনপি তা নিয়ে দলের শীর্ষ নেতারা গত রোববার রাতেই বৈঠক করেছেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় যে, তারা তিন দিনের মধ্যে রিটার্নিং অফিসের বাতিলাদেশের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করবেন। আপিলে ইতিবাচক ফল না পেলে আদালতে যাবেন। বিকল্প চিন্তাও আছে বলে জানায় দলীয় সূত্রগুলো। এসব সূত্র মতে, শেষ পর্যন্ত প্রার্থিতা না টিকলে শূন্য আসনে সমমনা ভালো স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়া হবে। আর বাদ পড়া হেভিওয়েট প্রার্থীদের আসনে আগে থেকেই দিয়ে রাখা বিকল্প প্রার্থীর দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয় কমিটির সমন্বয়কারী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব বরকতউল্লা বুলু বলেন, বাতিলকৃত প্রার্থীরা আপিল করবেন। যদি এতেও না হয় তবে বিকল্প চিন্তা করা হবে। আমরা দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, শেষ পর্যন্ত আমরা সব রকম আইনগত চেষ্টা চালিয়ে যাবে। কোনো উপায় না থাকলে তখন স্বতন্ত্র কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেয়ার বিষয়ে আমরা ভাবব।

দল মনে করছে, বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি। বাতিল হতে পারেÑ এমন আশঙ্কা থেকে একাধিক বিকল্প প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। তারপরও শেষ রক্ষা হলো না। কয়েকটি আসনে প্রার্থী শূন্য হয়ে পড়ল। আবার অনেক আসনে প্রধান যোগ্য প্রার্থী বাতিল হয়ে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত তুলনামূলক দুর্বল নেতা প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকল। এতে ভোটযুদ্ধে শক্তিশালী ও জনপ্রিয় প্রার্থীর সংখ্যাও কমে গেল বিএনপির। এ পরিস্থিতিতে কিছুটা চিন্তিত দল।

বিএনপি সূত্র জানায়, নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের শেষ দিন গত রোববার বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটি দিনভর মনিটরিং করেছে। একই সঙ্গে লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান টেলিফোনে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখেন। শূন্য আসনগুলোতে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে কাকে দলীয় সমর্থন দেয়া যায়- সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট যোগ্য ও সমমনা প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।

"