জামায়াতে ইসলামীর জন্য বিএনপির বড় ছাড়

প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

বদরুল আলম মজুমদার

বিএনপির প্রচেষ্টায় নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের শুরুতেই নিবন্ধনহীন জামায়াত ছিল একমাত্র ‘পথের কাঁটা’। স্বাধীনতাবিরোধী এ দলটিকে বিএনপির পাশ থেকে বিদায় করার মোক্ষম সুযোগটি সে সময় হাতে থাকলেও তা কোনোভাবেই কাজে লাগায়নি বিএনপি। উল্টো দিচ্ছে বড় ছাড়। যদিও দলের বেশির ভাগ অংশ সুযোগটি কাজে লাগাতে বেশ তৎপর ছিলেন। কিন্তু দলটির হাইকমান্ডের অনিচ্ছার কারণে তা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। বিএনপির একটি সূত্র জানায়, একাদশ নির্বাচন সামনে রেখে ড. কামালের মতো প্রগতিশীলদের সঙ্গে বিএনপি জোটবদ্ধ হলেও তারাও জামায়াতকে মেনে নিয়েই নির্বাচনে যাচ্ছে। এর একটি মাত্র কারণ ভোটের মাঠের ৫-৬ শতাংশ ভোটের হিসাব। যদিও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বধীন মহাজোট জামায়াত তথা স্বাধীনতাবিরোধীদের ভোট ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে নেওয়ার বিষয়টিকে নির্বাচনের মাঠে ভালোভাবেই কাজে লাগাবে। এমন বাস্তবতা সামনে রেখেও বিএনপি নিবন্ধনহীন দলটির হাতে নিজের দলের মার্কা তুলে দিচ্ছে। তাছাড়া ঐক্যফ্রন্টের বাইরে গিয়ে আসনও সমঝোতা করছে বিএনপি। জামায়াতকে খুশি রাখার লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শরিক বিএনপি ১২-১৫টি আসনে ছাড় দেওয়ার আগাম বার্তা দিয়েছে। দলটি আনুষ্ঠানিক চাহিদা প্রকাশের আগেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি তালিকায় জামায়াতের ১৬ জনকে নমিনেশন দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। চাহিদার দেওয়ার আগে এভাবে আগাম তালিকায় জামায়াতের প্রার্থীদের নাম দেওয়ার বিষয়টিকে অনেকে দলটির জন্য সুব্যবস্থা বলে মন্তব্য করেছেন। নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন না থাকায় জামায়াত তাদের প্রতীক দাড়ি পাল্লায় নির্বাচন করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষও তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে বিএনপি। যদিও জামায়াতের নেতারা স্বতন্ত্র প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে চাইছিলেন। কিন্তু বিএনপির হাইকমান্ড থেকে জানানো হয়, জামায়ত নেতারা নির্বাচন করলে অবশ্যই ধানের শীষ প্রতিকেই করতে হবে। প্রথমে রাজি না থাকলেও এমন প্রেক্ষাপটে জামায়াত ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করতে রাজি বলে দলটির লন্ডনের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জামায়াত সূত্র জানায়, নিজেদের প্রার্থী শক্তিশালী অবস্থানে আছে এমন ৫১টি আসনের তালিকা তারা বিএনপির হাতে তুলে দিয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে জামায়াতের নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে গণতন্ত্র রক্ষায় আমরা নির্বাচন করতে প্রস্তুত। দলের সেক্রেটারি মনোনয়ন ফরম কিনে এর আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছেন। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আপাতত ৬০টি আসনের মনোনয়ন ফরম কেনার জন্য প্রার্থীদের বলা হয়েছে। যেহেতু জোটগত নির্বাচন হবে, তাই আমরা যা চাইব সব তো পাওয়া যাবে না! শরিকদের ছাড় দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত কতগুলো আসন পাওয়া যায় তার জন্য অপেক্ষা করছি। তিনি আরো বলেন, চরম প্রতিকূলতার মধ্যে এবার নির্বাচন করতে হচ্ছে। তারপরও দেশ ও জনগণের স্বার্থে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

জোটগতভাবে নির্বাচন করার জন্য যে ৫১ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী দিতে চায় সেগুলো হলোÑ ঠাকুরগাঁও-২: মাওলানা আবদুল হাকিম; দিনাজপুর-১: মাওলানা আবু হানিফ; দিনাজপুর-৪: মাও. আফতাব উদ্দিন মোল্লা; দিনাজপুর-৬: আনোয়ারুল ইসলাম; নীলফামারী-২ (সদর): মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মন্টু; নীলফামারী-৩ (জলঢাকা): মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম; লালমনিরহাট-১ (পাটগ্রাম-হাতিবান্ধা): আবু হেনা মো. এরশাদ হোসেন সাজু; রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর): অধ্যাপক গোলাম রব্বানী; গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ): অধ্যাপক মাজেদুর রহমান; গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্যাপুর-পলাশবাড়ী): মাওলানা নজরুল ইসলাম; গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্ধগঞ্জ): ডা. আবদুর রহীম; জয়পুরহাট-১ (সদর-পাঁচবিবি): ডা. ফজলুর রহমান সাঈদ; বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ): অধ্যক্ষ শাহাদাতুজ্জামান; বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম): অধ্যক্ষ মাও. তায়েব আলী; চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) ড. কেরামত আলী; চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর): নুরুল ইসলাম বুলবুল; রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী -তানোর) অধ্যাপক মুজিবুর রহমান; নওগাঁ-৪ (মান্দা): খ ম আবদুর রাকিব।

সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া-সলঙ্গা): মাও রফিকুল ইসলাম খান; সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালি): অধ্যক্ষ আলী আলম; পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া): ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন; পাবনা-৫ (সদর): প্রিন্সিপাল ইকবাল হোসাইন; কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) মুহাম্মদ আবদুল গফুর; চুয়াডাঙ্গা-২ (দামুড়হুদা-জীবননগর): মোহাম্মদ রুহুল আমিন; ঝিনাইদহ-৩ (মহেশপুর-কোটচাঁদপুর): অধ্যাপক মতিয়ার রহমান; যশোর-১ (শার্শা): মাওলানা আজিজুর রহমান; যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা): আবু সাঈদ মুহাম্মদ শাহাদত হোসাইন; যশোর-৬ (কেশবপুর)- অধ্যাপক মুক্তার আলী; বাগেরহাট-৩ (মংলা-রামপাল): অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াদুদ; বাগেরহাট-৪ (মোড়েলগঞ্জ-সরনখোলা): অধ্যাপক আবদুল আলীম; খুলনা-৫ (ফুলতলা-ডুমুরিয়া): অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার; খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা): মাও. আবুল কালাম আযাদ; সাতক্ষীরা-১ (কলারোয়া-তালা): অধ্যক্ষ ইজ্জতুল্লাহ; সাতক্ষীরা-২ (সদর): মুহাদ্দিস আবদুল খালেক; সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-দেবহাটা): মুফতি রবিউল বাশার; সাতক্ষীরা-৪ (কালিগঞ্জ-শ্যামনগর): গাজী নজরুল ইসলাম।

এ ছাড়া পিরোজপুর-১ (সদর-নাজিরপুর-স্বরূপকাঠি): শামীম সাঈদী; পটুয়াখালী-২ (বাউফল): ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ; শেরপুর-১ (সদর): হাসান ইমাম ওয়াফি; ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া): অধ্যাপক জসিম উদ্দিন; ঢাকা-১৫ (কাফরুল-মিরপুর): ডা. শফিকুর রহমান; সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট): মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী; সিলেট-৬ (বিয়ানিবাজার-গোলাপগঞ্জ): মাওলানা হাবিবুর রহমান; কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট-সদর দক্ষিণ-লালমাই): মোহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত; কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম): ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের; ফেনী-৩ (সোনাগাজী-দাগনভুঞা): ডা. ফখরুদ্দিন মানিক; লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর-সদর আংশিক): মাস্টার রুহুল আমীন; চট্টগ্রাম-১০ (ডাবলমুরিং): আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী; চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া): মাওলানা শামসুল ইসলাম; চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী): মাওলানা জহিরুল ইসলাম; কক্সবাজার-২ (কুতুবদিয়া-মহেশখালী): হামিদুর রহমান আজাদ।

সর্বশেষ ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতকে ৩৫টি আসন দেয় এবং বিএনপি জামায়াতের যৌথ প্রার্থী (উন্মুক্ত আসন) ছিল ৪টি। সব মিলিয়ে ৩৯ আসনে লড়াই করে জামায়াত। এসব আসন থেকে যোগ-বিয়োগ করে ৫১ আসনকে টার্গেটে নিয়েছে দলটি। তারা মনে কওে, সবগুলো আসনে তারা ভালো করবে। সুতরাং, এই ৫১ আসন কোনোভাবেই ছাড় দিতে চান না তারা।

 

"