ভোট গ্রহণের তারিখ পেছাবে না : ইসি সচিব

সেনা মোতায়েন হবে নির্বাচনে

আইনশৃঙ্খলায় ব্যয় ৪৩০ কোটি টাকা

প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

গাজী শাহনেওয়াজ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনা মোতায়েন করা হবে। থাকবে বিজিবিও। ভোট গ্রহণের ৭ থেকে ১০ দিন আগে মাঠ পর্যায়ে সেনা ও বিজিবি মোতায়েন হতে পারে। ইসি সচিবালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ গতকাল এ তথ্য দিয়েছেন। তিনি নির্বাচন কমিশনে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ব্রিফিং করছিলেন। ভোট গ্রহণের তারিখ আর পেছানো হবে না বলেও তিনি জানান।

এদিকে নির্বাচনে মোট বরাদ্দের অর্ধেকের বেশি টাকা রাখা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা খাতে। সেখানে প্রচলিত বাহিনীর পাশাপাশি সামরিক, আধাসামরিকসহ অন্যান্য বাহিনীর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আনসার সদস্যদের জন্য ১৯০ কোটি টাকা, পুলিশের জন্য ১৬৫, সেনাবাহিনীর জন্য ৪৫ এবং র‌্যাব ও বিজিবির জন্য ৩০ কোটি টাকা। নির্বাচনের জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৩২ কোটি টাকা। এর আগে অর্থাৎ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৮০ কোটি টাকার মধ্যে শুধু আইনশৃঙ্খলায় বরাদ্দ ছিল ২০০ কোটি টাকা। আর নির্বাচন পরিচালনায় বরাদ্দ ছিল মাত্র ৮০ কোটি টাকা।

ইসির ব্যাখা হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ওই টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এমনকি বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়ে ভোট কার্যক্রম প্রতিহত করার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন রাখায় এ খাতে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। তবে এবার সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনমুখী হওয়ায় ভোট নিয়ে সংশয় নেই। ফলে প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোতায়েন করে এ নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বিধায় বরাদ্দ বাড়েনি।

এদিকে জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনীর জন্য আগাম বরাদ্দ রাখা হলেও ভোটের দায়িত্বে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না- এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল ইসিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। তবে ভোটের কয়েক দিন আগে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমেদ স্পষ্ট করেছেন। গতকাল নির্বাচনের রিটার্র্নিং কর্মকর্তাদের নির্বাচনের বিধিবিধান ও করণীয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা ও নির্বাচনের নির্দেশনা প্রদান অনুষ্ঠানে সচিব এ বিষয়টি পরিষ্কার করেন। সর্বশেষ গত বুধবার ঐক্যফ্রন্ট ইসির সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের জানিয়েছিল, ভোটের আগে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। ভোটের দু-তিন দিন আগেই ৩০০ সংসদীয় আসনের নির্বাচনী এলাকায় সেনাসদস্যরা দায়িত্বে নিয়োজিত হবেন। তবে জোটটির ভোট পেছনোর দাবি নাকচ করেছে ইসি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং বিএনপিসহ তাদের জোট অনেক আগে থেকেই সংসদ নির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন করার দাবি জানিয়ে আসছে। অপরদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তার বিরোধিতা করে বলেছে, ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন করার কোনো সুযোগ নেই। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে তারা দায়িত্ব¡ পালন করতে পারে। তবে ইসি এত দিন বিষয়টি নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেয়নি। সেনাবাহিনী মোতায়েন করার বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম সরাসরি বক্তব্য দিল ইসি। গতকাল কমিশন সচিবের বক্তব্যের পর এখন অপেক্ষার পালা বিশেষ এ বাহিনীকে কী ধরনের ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচনের মাঠে নামায় ইসি।

ইসি সচিব বলেন, কোথায় প্রিসাইডিং অফিসারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, সেটা এখন থেকে ঠিক করে রাখতে হবে। কোথায় থেকে ফল ঘোষণা করা হবে, আর কোথায় থেকে নির্বাচনী মালামাল সরবরাহ করা হবে- তাও এখনই ঠিক করে রাখতে হবে। বুধবার নয়াপল্টনে বিএনপি নেতাকর্মীদের শোডাউনকে কেন্দ্র করে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে এসব বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন ইসি সচিব। তিনি বলেন, নির্বাচনী পোস্টার-ব্যানার সরিয়ে ফেলাসহ মাঠের পরিবেশের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুশিয়ারি দেন ইসি সচিব।

ইসির সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম নির্বাচনে সেনাবাহিনীর অধীনে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনেও সেনাবাহিনী ছিল। সামরিক অভ্যুত্থানের পর এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করলে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তার সময়ের পুরো নির্বাচন হয়। পরে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনেও সেনাবাহিনী নির্বাচনের মাঠে ছিল। একাধারে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত সেনাবাহিনী মাঠে থেকে নির্বাচন সম্পন্ন হয়। তবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রকিবউদ্দীন কমিশন সেনাবাহিনীকে সেনানিবাসে অবস্থান করবে, নির্বাচনে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলে তাদের তলব করা মাত্রই নির্বাচনের কাজে যুক্ত হবে- এমন পরিপত্র জারি করে।

একই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বলেন, সাহসিকতার সঙ্গে সবাইকে কাজ করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা শিথিলতা দেখালে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এবারের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুখ দেখানো যাবে না বলেও মন্তব্য করেন মাহবুব তালুকদার। কেউ নির্বাচন ভন্ডুল করতে চাইলে আইনের মধ্য থেকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।

উল্লেখ্য, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৩০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ২৮ নভেম্বর। এরপর ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই চলবে। প্রার্থীরা ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে পারবেন।

"