জাতীয় নির্বাচন

ফেসবুকে সক্রিয় ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রচারকরা

‘অজান্তেই অনেকে সাইবার অপরাধে লিপ্ত’

প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

শরীফুল রুকন, চট্টগ্রাম

ফেসবুকের মাধ্যমে তথ্য সহজে দ্রুত ছড়ায়। এই সুযোগকে ব্যবহার করেই বিদ্বেষ ও ঘৃণ্য বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ফেসবুকে অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন রাজনৈতিক দলের তৃণমূল নেতাকর্মী থেকে শুরু করে দলীয় প্রধান পর্যন্ত। এক শ্রেণির ব্যবহারকারী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চরিত্রহননের অস্ত্র হিসেবে ফেসবুককে ব্যবহার করেই যাচ্ছে। তবে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ জানিয়েছে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে ফেসবুক। কেউ যদি ফেসবুকে তথ্যপ্রযুক্তি আইন লঙ্ঘন করে তবে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।

চট্টগ্রামের একজন রাজনীতিবিদ বলেন, সামনে নির্বাচন। রাজনীতির কঠিন সময়। নিজেদের কাজের প্রচার-প্রসারের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বাড়িয়েছেন রাজনীতিবিদরা। নিজের অভিমত প্রকাশের পাশাপাশি অন্যের অভিমতে মন্তব্য করে নিজের মেধা, প্রজ্ঞা ও আদর্শ তুলে ধরছেন অনেক রাজনীতিবিদ। আবার স্বজ্ঞানে কিংবা নিজের অজান্তে নিজেদের কোন্দলকে সামনে নিয়ে আসছেন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সাইবার অপরাধের মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধের পথও অজান্তে বেছে নিয়েছেন কেউ কেউ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেসবুকে কাউকে নিয়ে মানহানিকর বা বিভ্রান্তিমূলক কিছু পোস্ট করলে, ছবি বা ভিডিও আপলোড করলে, কারো নামে অ্যাকাউন্ট খুলে বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট দিলে, কোনো স্ট্যাটাস দিলে কিংবা শেয়ার বা লাইক দিলেও সাইবার অপরাধ হবে। কাউকে ইলেকট্রনিক্সের মাধ্যমে হুমকি দিলে, অশালীন কোনো কিছু পাঠালে কিংবা দেশবিরোধী কোনো কিছু করলে তাতেও সাইবার অপরাধ হবে। আবার ইলেকট্রনিক্সের মাধ্যমে হ্যাক করলে, ভাইরাস ছড়ালে কিংবা কোনো সিস্টেমে অনধিকার প্রবেশ করলে সাইবার অপরাধ হতে পারে। এ ছাড়া অনলাইনে যেকোনো অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত হলে তাও সাইবার অপরাধ। তথ্যপ্রযুক্তি আইনে এই ধরনের সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে ভুক্তভোগীর।

আবার মানহানির অভিযোগ এনে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা করা যায়। ফৌজদারি আদালতে মানহানির মামলা করার ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের করতে হয়। সে অভিযোগ শুনে আদালত অভিযোগে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত করতে বা সরাসরি আমলে নিয়ে সমন জারি করতে পারেন। তবে মানহানির মামলায় সরাসরি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয় না। সমন দেওয়ার পর যদি কোনো ব্যক্তি আদালতে হাজির না হন, সে ক্ষেত্রে বিচারক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন।

এ দিকে গত ২৮ জুলাই চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী যুব মহিলা লীগের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এতে একজন আহ্বায়ক, চারজন যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ২৮ জনকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়। ওই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক জুলেখা বেগম ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টা ২৩ মিনিটে তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ... খুব দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, আহ্বায়ক সায়রা বানু রৌশনি স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে সদ্য ঘোষিত কমিটির নেত্রীদের না জানিয়ে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে পদ-পদবী দেওয়ার নামে আর্থিক লেনদেন করছেন। কমিটির মেয়েদের নামে বাজে মন্তব্য ও মিডিয়াতে ভুয়া নিউজ পাঠিয়ে যাকে-তাকে মহানগর নেত্রী বানিয়ে নিউজ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন জুলেখার। বিভিন্ন এলাকার মেয়েদের পদ-পদবীর প্রলোভন দেখিয়ে রৌশনী নিজের বাসার জন্য বাজার-সদাই যেমন হলুদ, মরিচের গুড়া, পোলাও’র চাল, দেশি মুরগি চেয়েছেন বলেও ওই ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন জুলেখা বেগম। জুলেখা বেগমের ওই ফেসবুক পোস্টে বিতর্কিত মন্তব্য করেন আওয়ামী যুব মহিলা লীগের আরো দুই নেত্রী। এসব কারণে ক্ষুব্ধ সায়রা বানু রৌশনী আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন। গত ৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আল ইমরান খানের আদালতে তিনি মামলা দায়ের করেন। এতে আসামি হয় যুব মহিলা লীগের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক জুলেখা বেগম, মহানগর কমিটির সদস্য ও ৭নং ওয়ার্ডের সভাপতি সোনিয়া আজাদ এবং ৩৯নং ওয়ার্ডের ইউনিট আহ্বায়ক আসমানী ঝুমুর। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। পরে আদালতে হাজির হয়ে আসামিরা জামিন নিয়েছেন।

উদ্দেশে প্রণোদিতভাবে ফেসবুকের ওই স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছে দাবি করে সায়রা বানু রৌশনী বলেন, জুলেখা আমার কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক। ভিত্তিহীন, মিথ্যা অভিযোগ তুলে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন। আইন অনুযায়ী এভাবে তো কেউ কারো বিরুদ্ধে লিখতে পারেন না।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরিবারের সদস্যদের জড়িয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট শেয়ারের অভিযোগে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের বন্দর জোনের ট্রাফিক পরিদর্শক (টিআই-প্রশাসন) আবুল কাশেম চৌধুরীর বিরুদ্ধে গত ১৯ আগস্ট নগরের গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ড যুবলীগের সহ-দফতর সম্পাদক শেখ আহম্মদ আদালতে মামলা করেন। সে দিন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আল ইমরান খানের আদালতে মামলাটি গ্রহণ করে আসামির বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। মামলায় একমাত্র আসামি ট্রাফিক পরিদর্শক আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে দন্ডবিধি ৫০০, ৫০১ ও ৫০৫(ঘ) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে টিআই আবুল কাশেম চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর তা প্রত্যাহারের করেন যুবলীগ নেতা শেখ আহম্মদ। মামলা প্রত্যাহারের আবেদনটি গত ২৪ সেপ্টেম্বর মঞ্জুর করেন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আল ইমরান খানের আদালত। সে সময় বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুরজিত রাহা দাশু বলেছিলেন, প্রতিপক্ষ ট্রাফিক পরিদর্শক আবুল কাশেম চৌধুরীর সঙ্গে আমার মক্কেলের আপোষ হয়েছে। তাই আপোষের ভিত্তিতে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। আদালত প্রত্যাহারের দরখাস্ত মঞ্জুর করেছেন।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মো. মিজানুর রহমান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নজরদারি করতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে একজন অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে একটি দল আছে। এই দলের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্র ও সমাজের বিরুদ্ধে যারা অপরাধ করবে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের প্রধান কার্যালয়ের আইন শাখার অনুমতি নিয়ে এই কমিটি মামলা করে।

তিনি আরো বলেন, কেউ অভিযোগ করুক আর নাই করুক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে যারা অপরাধ করবে, তাদের অপরাধ এই নগর পুলিশের দলটির মনিটরিংয়ের আওতায় আসলে আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে তাদের বিরুদ্ধে এই দলটি ব্যবস্থা নেবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বেশির ভাগই শিক্ষিত। কিছু দুষ্টু শিক্ষিত লোক আছে ফেসবুকের অপব্যবহার করে। এই ফেসবুকের মাধ্যমে মিথ্যা, অশ্লীল, মানহানিকর তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করবে।

তিনি বলেন, সামনে নির্বাচনকে ঘিরে এক রাজনীতিবিদ অন্য রাজনীতিবিদকে ঘায়েল করার জন্য ফেসবুক ব্যবহার করবেন। বিশেষ করে প্রতিপক্ষ রাজনীতিবিদকে দল থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত করার জন্য, তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ব্যস্ত রাখার জন্য, কিংবা তাকে জিম্মি করে ফায়দা লুটার জন্য এই ধরনের কাজ করতে পারে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

 

"