সরকারি ওয়েবসাইট নকল করে অভিনব প্রতারণা!

পরীক্ষার ফল তৈরি করে নকল ওয়েবসাইটে আপলোড কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় একটি চক্র

প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

আসল ওয়েবসাইটে যেসব কন্টেন্ট আছে, নকলটিতেও ঠিক সেসব কন্টেন্টই আছে। শুধু ওয়েবসাইটের নামের শেষে ‘ডটকমের’ জায়গায় ‘ডটওআরজি’ লেখা রয়েছে। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) নামে এভাবেই নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা চালিয়ে আসছিল একটি চক্র। অংশগ্রহণ ছাড়াই শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করিয়ে তালিকাভুক্ত করার জন্য বিভিন্ন প্রার্থীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিত চক্রটি। তারপর নিজেরা পরীক্ষার ফল তৈরি করে নকল ওয়েবসাইটে আপলোড করে সংশ্লিষ্ট সেই প্রার্থীকে দেখাত। এভাবেই কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল প্রতারকরা।

এমন অভিনব ডিজিটাল প্রতারণার একাধিক অভিযোগ পেয়ে সম্প্রতি ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগকে জানায়, এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষ। পরে চক্রটিকে ধরতে অনুসন্ধানে নামে গোয়েন্দা পুলিশ। একপর্যায়ে গত বুধবার রাজধানীর বেইলি রোড থেকে ইয়াছিন আরাফাত তানিম নামের প্রতারক চক্রের এক সদস্যকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় গোয়েন্দারা। ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের উপকমিশনার মো. আলিমুজ্জামান বলেন, চক্রটিতে একাধিক সদস্য যুক্ত আছে। আমরা তানিমকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে এনেছি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার সহযোগীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

গত ১ নভেম্বর এনটিআরসিএর পরিচালক ফারহানা ইয়াসমিন জেনি ডিএমপি কমিশনারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানান, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত স্বচ্ছতা, সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার আবেদনপত্র গ্রহণ, ফলাফল প্রকাশ, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি লেভেলে শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্যে শূন্যপদের ই-চাহিদা গ্রহণ, শিক্ষক নিয়োগে সুপারিশ কার্যক্রম, সম্মিলিত জাতীয় মেধাতালিকা প্রণয়ন এবং নিবন্ধন সনদ যাচাইসহ বিভিন্ন ধরনের অনলাইন সেবা দিয়ে থাকে। এ কার্যক্রমে কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই। সম্প্রতি জানা গেছে, এনটিআরসিএর নামে নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে একটি চক্র প্রতারণা করছে। তারা ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করাসহ অবৈধ অর্থ আদায়ের মাধ্যমে এনটিআরসিএর ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

এনটিআরসিএর চিঠি পেয়ে অনুসন্ধানের জন্য সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগকে নির্দেশ দেন ডিএমপি কমিশনার। পরে সাইবার সিকিউরিটি টিম প্রযুক্তির সহায়তায় অনুসন্ধান করে জানতে পারে, নকল ওয়েবসাইটটি পটুয়াখালীর ইয়াছিন আরাফাত ওরফে তানিম নামের একজন পরিচালনা করছে। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ইয়াছিন আরাফাতের অবস্থান শনাক্ত করে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ওই দিনই তার বিরুদ্ধে রমনা থানায় ডিজিটাল সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে।

এদিকে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াছিন আরাফাত জানান, তিনি খন্দকার রিফাত এম হকের কাছ থেকে নকল ওয়েবসাইটের ডোমেইন ও হোস্টিং কিনে এনটিআরসিএর ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি করেন। এরপর ইমতিয়াজ নাইম ওরফে শাওন নামে তার এক সহযোগীসহ শিক্ষক নিবন্ধনকারী বিভিন্ন চাকরি প্রার্থীর সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, প্রতারণাকারী এই চক্রটির সদস্যরা অনেক চতুর। তারা ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ নিয়ে শিক্ষক নিবন্ধন তালিকায় নাম যুক্ত করিয়ে দেওয়ার কথা বলত। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর তারা ভুক্তভোগীকে নিজেদের তৈরি করা ওয়েবসাইটে তাদের নাম দেখাত। এর আগেই তারা নিজেদের নকল ওয়েবসাইটে অন্যান্য অনেক নামের সঙ্গে ভুক্তভোগীর নাম যুক্ত করে দিত। তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চক্রটি কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে প্রতারণা করার কথা স্বীকার করলেও অনেক কিছু এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের সঙ্গে আর কারা জড়িত এবং এখন পর্যন্ত কতজনের সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণা করেছে তা জানার চেষ্টা করছি।

এদিকে, গত ৩০ অক্টোবর এনটিআরসিএর পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে ভুয়া ওয়েবসাইট থেকে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ভুয়া ওয়েবসাইটে যোগাযোগ না করা এবং কারো সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয় বা এনটিআরসিএ-সংক্রান্ত অন্য যেকোনো বিষয়ে আর্থিক লেনদেন না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ করা হলো।’

 

 

"