শরণার্থী হিসেবে রোহিঙ্গা নিতে আগ্রহী কানাডা

প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মিয়ানমারে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ভয়াবহতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয়ের প্রস্তাব দিয়েছে কানাডা। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে এখন পর্যন্ত সাড়া না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছে দেশটি। কানাডার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যুক্তরাজ্যভিত্তিক এক গণমাধ্যমকে এমন তথ্য জানিয়েছেন। একজন কানাডিয়ান কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কানাডার প্রস্তাব খতিয়ে দেখছে।

বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কী ছিল সে ব্যাপারে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন আরেক কর্মকর্তা। তবে কানাডার পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন তিনি। এ দিকে রয়টার্সের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করে সাড়া পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এবং শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। খুন, ধর্ষণ আর অগ্নিসংযোগের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে আখ্যা দিলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিশেষ দূত হিসেবে বব রে-কে নিয়োগ দেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন টুডো। এই বছরের এপ্রিলে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের কানাডায় আশ্রয় ও চলমান মানবিক সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির সুপারিশ করেন বব রে।

চলতি বছরের মে মাসে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি তার দেশের সমর্থন অব্যাহত রাখার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, কানাডা এই সমস্যার দ্রুত সমাধান চায়।

গত বৃহস্পতিবার (৮ নভেম্বর) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কানাডীয় এক কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ফ্রিল্যান্ড বাংলাদেশ সফরের সময় কিছুসংখ্যক অসহায় রোহিঙ্গাকে কানাডায় আশ্রয় দেওয়া প্রস্তাব দিয়েছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, সে প্রস্তাব এখনো বহাল আছে। তার ভাষায়, ‘ফ্রিল্যান্ড বলেছিলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনা করতে চায় কানাডা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, কর্মকর্তারা এটা দেখবেন।’

জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৯ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে কিছুসংখ্যক ১৯৭৮, ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে পালিয়ে এসেছে।

কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী ও নাগরিকত্ব-বিষয়ক মুখপাত্র শ্যানন কের বলেন, ২০০৬ সাল থেকে ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের ক্যাম্পে থাকা তিন শতাধিক রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসিত করেছে কানাডা। তবে ২০১০ সাল থেকে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের অনুমতি দিচ্ছে না বাংলাদেশ। ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার রোহিঙ্গার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জন্য কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ দিতে বাংলাদেশের অনুমতি চায় ইউএনএইচসিআর।

কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গিলাউমে বেরুবেও বাংলাদেশ থেকে কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গাকে নিতে কানাডার প্রস্তাবের বিষযটি নিশ্চিত করেছেন। তবে এ ব্যাপারে বাংলাদেশ থেকে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে সে ব্যাপারে বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি। একে ‘গোপনীয়’ বিষয় বলে উল্লেখ করেন বেরুবে।

কানাডার অভিবাসন শরণার্থী ও নাগরিকত্ব বিষয়ক মুখপাত্র বিয়াট্রিস ফেনেলন বলেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে কানাডার সর্বশেষ পরিকল্পনাটি ২০১৭ সালে আইএসের নিপীড়নের শিকার ১২০০ ইরাকি ইয়াজিদিকে পুনর্বাসনের মতোই একটি উদ্যোগ। তিনি বলেন, ‘ধাইএসের নিপীড়নের শিকারদের পুনর্বাসনের সময় আমরা এ সম্প্রদায়ের (ইয়াজিদি) বিশাল অংশকেই পরিকল্পনার আওতায় নেইনি। বরং যাদের জন্য পুনর্বাসন সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সমাধান সে রকম কিছুসংখ্যক মানুষকে প্রাধান্য দিয়েছি আমরা।’ রোহিঙ্গা প্রশ্নেও একই পরিকল্পনা রয়েছে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ছাড়পত্র দিচ্ছে না।’

ইউএনএইচসিআর-এর মুখপাত্র ক্যারোলিন গ্লুক বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। বিদেশে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার রোহিঙ্গাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ধর্ষণের কারণে জন্ম নেওয়া শিশু, যাদের জীবনভর সমাজের লেপ্টে দেওয়া কলঙ্ক বয়ে বেড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে; তাদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।’

রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা প্রশ্নে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের সেনাদের ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং সন্তান জন্ম দিয়েছেন; এমন রোহিঙ্গা নারীদেরকে কানাডায় পুনর্বাসিত করলে তাদের জন্য আতঙ্ক কাটাতে সুবিধা হবে। রাখাইন সংকট নিয়ে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক প্যানেলে কাজ করেছিলেন সাবেক ডাচ কূটনীতিক লায়েতিমিয়া ভান দেন অসুম। নির্দিষ্ট কিছু রোহিঙ্গাকে কানাডায় পুনর্বাসনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘মানবিক বিবেচনা থেকেই এটা করতে হবে। নির্দিষ্ট এ জাতিগোষ্ঠীর জন্য যদি সীমিত পরিমাণেও পুনর্বাসনের সুযোগ আসে, তবে বাংলাদেশের উচিত আবারও ভাবা এবং তাদের এক্সিট ভিসা দেওয়া।’

 

"