১৪ দল-ঐক্যফ্রন্ট সংলাপ

ভোট পিছিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাব নাকচ

‘বল’ শেখ হাসিনার কোর্টে : ড. কামাল

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ ও আন্তরিক পরিবেশে শেষ হলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গে বিএনপিকে নিয়ে ড. কামাল হোসেনের গড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের মধ্যে দ্বিতীয় দফার সংলাপ। একাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যে ধারাবাহিক সংলাপ শুরু হয়েছিল তার মধ্যে শুধু জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গেই দ্বিতীয় দফায় সংলাপ হয় ক্ষমতাসীনদের। সংলাপে একে-অপরের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখতে উভয়পক্ষই সম্মত হয়েছে। গতকাল বুধবার বেলা ১১টা থেকে এই সংলাপ শুরু হয়, শেষ হয় দুপুর সোয়া ২টার দিকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এ সংলাপে বেশ কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পায়। এদিকে গণভবনে প্রথম দফা সংলাপের সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে দেশজুড়ে দায়ের হওয়া ‘গায়েবি’ মামলার তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছে দিয়েছে বিএনপি।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, দ্বিতীয় দফায় সংলাপেও দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। তারা মন খুলে কথা বলেছেন, আমরাও কথা বলেছি। তারা সাত দফা দাবি আবারও তুলে ধরেছেন। নতুন করে ঐক্যফ্রন্ট একটি দাবি তুলেছে। সংসদ ভেঙে দিয়ে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন ও ১০ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব করেছে তারা। প্রধানমন্ত্রী তাদের এই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। আমরা সংবিধানের বাইরে যাব না। তবে তাদের সাত দফা দাবির বেশকিছু দাবি মানা হয়েছে। তবে দ্বিতীয় দফা সংলাপেও কোনো ‘সমাধান’ পাননি বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, আলোচনা মনঃপূত হয়নি। সংলাপে কোনো সমাধান আসেনি।

সংলাপ শেষে বিকেলে ড. কামাল হোসেনে বেইলি রোডের বাড়িতে সংবাদ সম্মেলনে দ্বিতীয় সংলাপের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। সেখানে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ‘বল’ এখন প্রধানমন্ত্রীর কোর্টে। আমরা সংলাপের মাধ্যমে দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেছি। আমরা চেয়েছি শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবি আদায় করতে। এরপর যা হবে তার দায়দায়িত্ব সরকারের।

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে মন্তব্য করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, আমরা আন্দোলনেই আছি। আন্দোলনকে সংলাপের অংশ হিসেবেই নিয়েছি। সংলাপে সমাধান না এলে সেই দায়দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তাবে। জনগণকে নিয়ে দাবি আদায় করা হবে। নির্বাচন পেছানোর দাবি নিয়ে নয় জনগণের দাবি নিয়ে সংলাপে বসেছি।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সুলতান মোহাম্মদ মনসুর প্রমুখ।

সংলাপ শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্টের নেতারা নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি করেছেন। আমরা বলেছি, সত্যিকারের রাজবন্দি হলে মুক্তি দেওয়া হবে। তারা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে ইসি কাজ করবে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তাদের অনুরোধ করেছেন, আপনারা নির্বাচনে আসুন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা হবে। আমরা দেখিয়ে দেব এই সরকারের অধীনেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। এরপর যদি আপনারা জেতেন আপনারা ক্ষমতায় আসবেন আর আমরা জিতলে আমরা আসব।’

তিনি বলেন, সংসদ যেদিন বসেছে সেদিন থেকে হিসাব করে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ঐক্যফ্রন্ট সংলাপে প্রস্তাব দিয়েছে সংসদের মেয়াদ শেষে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার। কিন্তু এটা সংবিধানের বাইরে। তাই আমরা এতে সম্মত হইনি। আর একজন প্রধান উপদেষ্টাসহ ১০ জন উপদেষ্টা রেখে নির্বাচন করার প্রস্তাবও গ্রহণযোগ্য নয়।

কাদের বলেন, এটা নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার একটা বাহানা। এই পিছিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে ফাঁকফোকর হয়ত খুলে দেওয়া হচ্ছে। যেখান দিয়ে তৃতীয় কোনো অপশক্তি এসে ওয়ান ইলেভেনের মতো সেই অনভিপ্রেত অস্বাভাবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। আমরা সবাই সেটা মনে করছি।

আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধান পরিপন্থী ও সাংঘর্ষিক কিছু বক্তব্য তারা নিয়ে এসেছে, যেটা গ্রহণযোগ্য না। সংলাপ এখানে শেষ। শিডিউল ঘোষণার পর তারা যদি কোনো ব্যাপারে আবার বসতে চান, আপত্তি নেই।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, দুই পক্ষই নিজেদের দাবিতে অনড়। কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি। ঐক্যফ্রন্ট আবারও সংলাপের দাবি জানিয়েছে। এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, সংলাপে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি। তবে নির্বাচন ঘিরে ধরপাকড় হবে না এবং নতুন মামলা হবে না বলে প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টকে।

বিএনপি দাবি করে আসছে, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশে ৪ হাজার ৩৭১টি মামলায় বিএনপির ২৫ লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাও এসব মামলার আসামি। ওই তালিকা এদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবদুল হামিদের কাছে পৌঁছে দেন বিএনপির সহ দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিতু। এই তালিকার অনুলিপি আওয়ামী লীগ সভপতির কার্যালয়েও পাঠানো হয়েছে।

বৈঠকে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের মধ্যে ছিলেন ড. কামাল হোসেন, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফা মোহসীন মন্টু, কার্যকরী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, এস এম আকরাম, জেএসডি সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন ও ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দলের প্রতিনিধিদলে ছিলেন ওবায়দুল কাদের, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিম, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আনিসুল হক, ডা. দীপু মনি, শ ম রেজাউল করিম, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন।

এর আগে গত ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে গণভবনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ হয়। সেই সংলাপ শেষে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা অভিযোগ করেন, তারা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তাদের সাত দফা দাবি তুললেও ভালো কথা শোনা ছাড়া সুনির্দিষ্ট কোনো সমাধান পাননি। এরপর ছোট পরিসরে সংলাপের জন্য গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি দেয় ঐক্যফ্রন্ট। এরই অংশ হিসেবে গতকাল দ্বিতীয় দফা সংলাপ হলো।

"