মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার হস্তান্তর নিয়ে নানা জটিলতা

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

হাসান ইমন

নির্ধারিত সময় ৫ নভেম্বর পার হলেও ঢাকার মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার হস্তান্তরের বিষয়ে এখনো কোনো সুরহা হয়নি। কবে নাগাদ হস্তান্তর হবে বলতে পারছে না কেউই। তবে নতুন করে ফ্লাইওভারটি হস্তান্তরের বিষয়ে নানা জটিলতা শুরু হয়েছে। সংস্থা দুইটি বলছে, ফ্লাইওভারে নানা ত্রুটি রয়েছে। আগে সেগুলো সমাধান করে দিতে হবে নতুবা ত্রুটিগুলো সমাধানের জন্য সিটি করপোরেশনকে বরাদ্দ দিতে হবে। তাহলেই সিটি করপোরেশন ফ্লাইওভারটি বুঝে নেবে।

জানা যায়, গত ২২ অক্টোবর এক সভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন মগবাজার- মৌচাক ফ্লাইওভার হস্তান্তরের জন্য পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে দেন। ওই কমিটিকে ৫ নভেম্বরের মধ্যে ফ্লাইওভারটি হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দিয়েছিলেন। নির্ধারিত তারিখ পার হলেও এখনো এ ফ্লাইওভারটির দায়িত্ব বুঝে নেয়নি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।

সংস্থা দুইটি বলছে, নকশা অনুমোদনের পর থেকেই মগবাজার মৌচাক-ফ্লাইওভার নিয়ে নানা ত্রুটি দেখা দেয়। এর মধ্যে ফ্লাইওভারে ট্রাফিক সিগন্যাল, বৈদ্যুতিক বাতি নষ্ট, বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, বাম দিকে স্টিয়ারিং, যানজট লেগে থাকা, ওঠা-নামার র‌্যাম্প জটিলতাসহ নামার লুপে যানজট লেগেই থাকে। যা ফ্লাইওভারের ওপরে চলাচলকারীদের জন্য ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। আর ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় ফুটপাত, সড়ক ও ড্রেন ভেঙে ফেলা হয়েছে। কথা ছিল, ফ্লাইওভার নির্মাণ শেষে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ফুটপাত, সড়ক ও ড্রেনগুলো তৈরি করে দেবে। কিন্তু নির্মাণ শেষে শুধু সড়কটি ঢালাই দিয়ে চলে গেছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। বাকি ফুটপাত ও ড্রেনগুলো নষ্টই রয়ে গেল। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় ময়লা পানি জমে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। এসব ত্রুটি সমাধান করে দিতে হবে। আর না হয় ত্রুটিগুলো সমাধানের জন্য মন্ত্রণালয়কে টাকা বরাদ্দ দিতে হবে। তাহলে ফ্লাইওভারটি বুঝিয়ে নেওয়া সম্ভব। তবে কবে নাগাদ হস্তান্তর হতে সেটা বলা কঠিন। এ বিষয়টা নিয়ে কয়েক দফায় বৈঠক হয়েছে। হস্তান্তরের বিষয়টা এখন প্রক্রিয়াধীন।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ বলেন, মগবাজার- মৌচাক ফ্লাইওভার হস্তান্তরের বিষয়ে কিছু জটিলতা রয়ে গেছে। এরমধ্যে ফ্লাইওভারে কিছু ত্রুটি ধরা পড়েছে। সেগুলো সমাধান করতে হবে। এ ছাড়া ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় ফুটপাত ও ড্রেনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলো মেরামতের বরাদ্দ দিতে হবে। তাহলে ফ্লাইওভার বুঝে নেওয়া সম্ভব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঠিক কবে নাগাদ হস্তান্তর হবে সেটা বলা কঠিন। এটা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফা মিটিং হয়েছে। তবে হস্তান্তরের বিষয়টা এখনো প্রক্রিয়াধীন।

এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির আহ্বায়ক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নগর উন্নয়ন) মো. মাহবুব হোসেন বলেন, ফ্লাইওভারটি হস্তান্তরের কাজ চলছে। যেদিন মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে তার কয়েকদিন পর কমিটি করা হয়েছে। সে কারণে বেশি সময় না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা যায়নি। এখনো কাজ চলছে। কিছু সমঝোতা চুক্তি স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত করা হয়েছে।

প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী, ফ্লাইওভারটি এখনো দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এ জন্য বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিলেও নানা জটিলতায় তা পিছিয়ে পড়েছে। সিটি করপোরেশন বলছে, ফ্লাইওভারে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। এ জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ত্রুটিগুলো চিহ্নত করতে কয়েকটি কমিটিও গঠন করে। তবে, এসব কমিটির রিপোর্ট এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি ডিএসসিসি। এ জন্য বেশ কয়েকবার অভ্যন্তরীণ মিটিংও করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি আগ্রহী হলেও বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছে ডিএসসিসি। কিন্তু প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় বিষয়টি এখনো ঝুলে রয়েছে।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্লাইওভারের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও তার ব্যয়ভার দিতে হবে। তবে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন এর ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো মেরামতের জন্য তহবিল দিতে পারছে না নির্মাণকারী সংস্থা। তবে মন্ত্রণালয় প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ দিতে সম্মত হয়েছে বলে জানা গেছে। এর পরেও বেশ কয়েকটি বিষয়ে তারা সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি।

ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, ‘ফ্লাইওভারের ওপরে ও নিচে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে, সে বিষয়ে আমরা প্রতিবেদন তৈরি করছি। অনেক সময় দেখা যায়, ফ্লাইওভারের ওপরে ধুলাবালিসহ বিভিন্ন ধরনের ময়লা আবর্জনা পড়ে থাকে। ধুলায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সেগুলো অপসারণ করার জন্য কর্মী প্রয়োজন। এ ছাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও ফ্লাইওভারের প্রকল্প পরিচালক সুশান্ত কুমার পাল বলেন, ফ্লাইওভারটি ম্যানুয়ালভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে এটি হস্তান্তর বাকি রয়েছে। কীভাবে ফ্লাইওভারটির রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীদের বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কটির বাংলামোটর, মগবাজার, তেজগাঁও, মালিবাগ রেলগেট, রামপুরা অংশ পড়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায়। আর বাকি অংশ মৌচাক, মালিবাগ মোড়, রাজারবাগ, শান্তিনগর অংশ পড়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায়।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তিন তলাবিশিষ্ট চার লেনের এই ফ্লাইওভারটির দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার। এটি ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল। ১২১৮ কোটি ৮৯ হাজার ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এর প্রতি মিটারে খরচ হয়েছে ১৩ লাখ টাকা।

 

"