চার টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীর পদত্যাগ

এই সরকারই নির্বাচনকালীন সরকার : প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ সরকারই নির্বাচনকালীন (ভোটের) সরকার। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এ সরকারের কার্যপরিধি কমে যাবে, মন্ত্রীেেদর সরকারি সুযোগ-সুবিধাও থাকবে না। গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের পদত্যাগের নির্দেশ দেন। এর আগে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের ওষুধ ও সিরাজগঞ্জের বিসিক শিল্পপার্ক এবং সাভারের চামড়া শিল্পনগরী উদ্বোধন করেন ?প্রধানমন্ত্রী। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরই মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন চার টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী। তারা হলেন-  ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তারা পদত্যাগ করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের পদত্যাগের নির্দেশ আসে। মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

প্রসঙ্গত, ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান এই সরকারের শুরু থেকেই দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বে গঠিত মহাজোট সরকারে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তিনি। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

ইয়াফেস ওসমান ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তৎকালীন বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি দ্বিতীয়বারের মতো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই তিনি একই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

আর ২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি মোস্তাফা জব্বার মন্ত্রী হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করেন। তিনি ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন।

অনুষ্ঠানে সরকারপ্রধান বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে একটানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে আজকে বাংলাদেশ আর্থসামাজিকভাবে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ আজকে বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেলের স্বীকৃতি পাচ্ছে। দারিদ্র্য হ্রাস পাচ্ছে ও মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছেÑ এটাই আমরা চাই।’ সরকার সারা দেশে ১০০টি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ করছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানুষের কর্মসংস্থানের ওপর আমরা নজর দিচ্ছি। বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করে দিয়েছি। বিনিয়োগ যাতে হয়, দেশি-বিদেশি সে ব্যবস্থা আমরা করে দিচ্ছি।’

সাভারে চামড়া শিল্পনগরী গড়ার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হাজারীবাগে ট্যানারি একসময় ঢাকা ছোট ছিল, সেটা গ্রামের দিকেই ছিল। ধীরে ধীরে ঢাকা শহর বাড়তে থাকে। ট্যানারি বর্জ্য নিয়ে রাজধানীর মানুষ খুব কষ্টের জীবনযাপন করত। এটাকে সরিয়ে আমরা সাভারে শিল্পনগরী গড়ে তুলছি।’

প্রায় ১০০ দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রফতানির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওষুধের কাঁচামাল তৈরির জন্য একটা ব্যবস্থা করা দরকার। কারণ আমাদেরকে কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সেদিকে লক্ষ রেখে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট তৈরির ব্যবস্থা দরকার, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল যাতে আমরা দেশে উৎপাদন করতে পারি। সেজন্য আমরা মুন্সীগঞ্জে শিল্পনগরী করে দিচ্ছি।’ প্রতিটি জেলায় বিসিক শিল্পনগরী করার আইন বঙ্গবন্ধু করে দিয়েছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নব্বই ভাগের মতো দেশের চাহিদা সেখান থেকে মেটে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, উৎপাদনে দেশের চাহিদা মিটবে, বিদেশে রফতানি হবে, কর্মসংস্থান হবে, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে।’ পরিবেশ দূষণ যাতে না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের যেন কোনোভাবে দূষণ না হয়, সেজন্য বর্জ্য দূষণ থেকে রক্ষার ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি। সকলে এটা অনুসরণ করবেন।’

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে প্রিজম প্রকল্প থেকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনকে (বিসিক) শিল্পপার্ক ও শিল্পনগরী নির্মাণে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত শিল্প সচিব আবদুল হালিম ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে তিনটি প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব নজিবুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনের পর ভিডিও কনফারেন্সের সময় তিনটি জেলায় বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নির্বাচনকালীন সরকার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত নির্বাচনের আগে ছোট আকারে নির্বাচনকালীন সরকার করার কথা ভাবা হয়েছিল। কারণ তখন সংসদে বিএনপি ছিল। তাদের নির্বাচনকালীন সরকারে আনার জন্য সে চিন্তা করা হয়েছিল। এবার তো সংসদে বিএনপি নেই। আর নির্বাচনকালীন সরকারে অনির্বাচিত কাউকে রাখা যাবে না। তাই এ সরকারকে আর ছোট করার কোনো দরকার নেই।

চলতি বছর জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভায় সর্বশেষ রদপদলের পর এত দিন ৩০ জন মন্ত্রী, ১৭ জন প্রতিমন্ত্রী এবং দুজন উপমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তাদের মধ্যে ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য না হয়েও টেকনোক্র্যাট হিসেবে মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

মন্ত্রিসভার সদস্যরা ছাড়াও মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের দায়িত্বে আছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। আর মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে আছেন আরো পাঁচজন। আইন অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী প্রচারণাকালে সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা নিতে পারবেন না মন্ত্রী বা এমপিরা।

 

"