উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ‘ট্রেনে কাটা’ পড়ে মৃত্যু

এক বছরে নিহত ২১০০, ৫ বছরে ৪৪৫৪

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা এ-সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। রেললাইন ধরে অসতর্কভাবে হাঁটা, কানে হেডফোন লাগিয়ে রেললাইনের পাশ দিয়ে যাতায়াত, তাড়াহুড়া করে রেলক্রসিং পার হওয়া এবং চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে সেলফি তোলাসহ ছয় কারণে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। এ ছাড়া চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা তো আছেই।

শুধু ট্রেনে কাটা পড়ে নয়, ট্রেনকে ঘিরে হত্যাকা-ের মতো আরো ঘটনাও ঘটছে। যা নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে সাজানো হচ্ছে। আবার হত্যাকা-ের ক্ষেত্রে মেলে না ময়নাতদন্তের রিপোর্ট। ফলে জানা যায় না মৃত্যুর আসল রহস্য। কিছু ক্ষেত্রে রিপোর্ট পাওয়া গেলেও থাকে অন্য রহস্য। কীভাবে তার মৃত্যু হলো, কেন লোকটি ট্রেনে কাটা পড়ল কিংবা কেউ তাকে ট্রেন থেকে ফেলে দিল কী না তারও কোনো উত্তর মেলে না। সেসব রহস্য অন্ধকারেই থেকে যায়! মৃত্যুর ধরন দেখে দুর্ঘটনা মনে হলেও, দেখা যায়- হত্যাকা- চাপা দিতে খুনিরা লাশ এনে রেললাইনে ফেলে দুর্ঘটনা বলেও চালিয়ে দেয়। সে কাজে তারা অনেকাংশে সফলও হয়। এসব হত্যার রহস্য উদঘাটনে বরাবরই উদাসীন রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি)। রহস্য উদঘাটন না হওয়ায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ‘ট্রেনে কাটা’ মৃত্যু রহস্য! আবার ট্রেন দুর্ঘটনায় বেশির ভাগ মামলাই দায়ের করা হয় অপমৃত্যু হিসেবে। সেসবের সঠিক কোনো তদন্তও হয় না।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেললাইন থেকে উদ্ধার হওয়া লাশের ময়নাতদন্তে হত্যার আলামত পাওয়া খুবই কঠিন। কারণ লাশের অবস্থা এমন হয়ে যায়, সেখান থেকে খুনের আলামত-সংক্রান্ত কোনো কিছু উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। এ জন্য কাউকে অচেতন করে রেললাইনে ফেলে রেখে হত্যা করা দুর্বৃত্তদের প্রধান অস্ত্র! আর পুলিশ ভিসেরা পরীক্ষার আবেদন না করায় নিহতদের ভিসেরা সংরক্ষণ করে অচেতনের বিষয়টিও রয়ে যায় আড়ালেই। মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ হলে অনেক চিকিৎসক আবার ‘হত্যা’, ‘আত্মহত্যা’ নাকি ‘দুর্ঘটনাজনিত’- এসব কিছুই উল্লেখ করেন না।

১৮৯০ সালের রেল আইনে রেললাইনের দুই পাশে ১০ ফুটের মধ্যে মানুষের চলাচল নিষিদ্ধ। এমনকি এর মধ্যে গরু-ছাগল ঢুকে পড়লে সেটিকেও নিলামে বিক্রি করে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে রেল কর্তৃপক্ষের। রেলে কাটা পড়ে কেউ আহত হলে উল্টো ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধেই মামলা করতে পারে রেলওয়ে। তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও রেলওয়ে পুলিশের ইতিহাসে এমন কোনো নজির নেই। কিন্তু এতসব কঠোর নিয়ম থাকার পরও প্রতিবছর হাজারের বেশি মানুষের এভাবে মৃত্যু হয় কেন?

জানা গেছে, ট্রেন বা রেললাইনে কাটা পড়ে সম্ভবত বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। রেললাইন ধরে হরহামেশাই লোকজন ফ্রি স্টাইলে চলাচল করছে। শুধু কি তাই, রেললাইন ঘিরে বসতি, বাজারও গড়ে উঠেছে। যা চলে আসছে যুগের পর যুগ। যেন দেখার কেউ নেই। অথচ এটি অবৈধ, দ-নীয় অপরাধ। রেললাইন ও এর দুই পাশে ১০ ফুট করে সবসময়ের জন্য ১৪৪ ধারা জারি বহাল আছে। জেনে হোক কিংবা না জেনে এই আইন মানছে কেউ।

রেললাইন ধরে না হাঁটার পরামর্শ দিয়ে রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি মো. শামসুদ্দিন বলেন, সচেতনতার অভাবেই ট্রেনে কাটা পড়ে লোকজন প্রাণ হারাচ্ছে। ট্রেন তার নিজস্ব পথেই চলে। সেই পথে কোনো অবস্থাতেই মানুষের হেঁটেচলা রাস্তা বা পথ হতে পারে না। কিন্তু রেললাইনের অংশ দখল, কাঁচাবাজার বসানো এবং অবৈধ রাস্তা তৈরি করে রেললাইন ঘেঁষে চলাচলা করছে মানুষ। রেললাইনে প্রতিনিয়ত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। পুনরায় রেললাইন দখল করা হচ্ছে। এ কারণেই রেল দুর্ঘটনা বাড়ছে। রেললাইন দিয়ে হাঁটা বন্ধ করতে না পারলে এমন মৃত্যু বন্ধ করা যাবে না। শুধু আইন দিয়ে নয়, সাধারণ মানুষ সচেতন হলে মর্মান্তিক মৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব।

রেলওয়ের ডিআইজি শামসুদ্দিন আরো বলেন, রেললাইন থেকে উদ্ধার করা প্রতিটি লাশের ঘটনায় মামলা হয়। পুলিশ গুরুত্বসহকারে তদন্তও করে। তদন্তে হত্যা মনে হলে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। রেললাইন থেকে কারো লাশ উদ্ধারের পর সে আত্মহত্যা করেছে, এটি প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে আত্মহত্যা বলার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, দেশে ট্রেন দুর্ঘটনা বেশি হওয়ার প্রথম কারণ হচ্ছে রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। দুর্ঘটনা কেন হচ্ছে তার কারণ জানার কোনো চেষ্টা নেই সংশ্লিষ্টদের। নেই কোনো জবাবদিহিতাও। কাউকে শাস্তি দিতে পারলে হয়তো দুর্ঘটনাও কমত। দুর্ঘটনা কমাতে হলে রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি লাইনম্যান ও জনবল বাড়ানোরও পরামর্শ এই বিশেষজ্ঞের।

রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালে সারা দেশে ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা দুর্ঘটনায় ২১০০ লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে তিন হাজার ৪৬৭ জন পুরুষ এবং ৯৮৭ জন নারী। এসব ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে চার হাজার ৪০৬টি। এই সময়ে রেললাইনে হত্যা করা হয়েছে ১৩৪ জনকে। অপরদিকে, গত পাঁচ বছরে ট্রেনে কাটা কিংবা অন্যান্য দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৪ হাজার ৪৫৪ জন। এদের মধ্যে হত্যাকা-ের শিকার হয়েছে ১৩৪ জন। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ৩৮ জন, ২০১৪ সালে ৩৩ জন, ২০১৫ সালে ২৪, ২০১৬ সালে ২০ এবং গত বছরে ১৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশ বলছে, এ পর্যন্ত রেললাইনে হত্যার ঘটনায় যত মামলা হয়েছে এর মধ্যে মাত্র ১৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আর পুলিশের কাছে তদন্তাধীন মুলতুবি মামলা রয়েছে ১৯টি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রেললাইনে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে দ্রুত রেলক্রসিং পার হতে গিয়ে। পাঁচ বছরে এই কারণে প্রাণ গেছে এক হাজার ৭১৫ জনের। মোবাইলে কথা বলা ও কানে ইয়ার ফোন থাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে ৩২২ জনের, ট্রেনলাইনের ওপর বসা বা চলাচলের কারণে এক হাজার ৯৭৬ জনের, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে ১৪৬ জনের এবং অন্যান্য কারণে ২৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ট্রেনে কাটা ও দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৪৬৬ জন। এতে অপমৃত্যু মামলা হয়েছে ৪৪২টি।

চলতি বছরের ১৪ জুন রাজধানীর খিলগাঁও রেললাইন থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীনের ছেলে সুমন জাহিদের (৫২) দ্বিখ-িত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বাসা থেকে ডেকে নেওয়ার ২ ঘণ্টা পর তার লাশ মেলে রেললাইনে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত পলাতক আসামি চৌধুরী মঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন সুমন জাহিদ। ৩০ মার্চ মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলা রেল স্টেশনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় জয় ও সন্ধ্যা নামের দুই কলেজ শিক্ষার্থীর লাশ। দুই পরিবারের অভিযোগ, এটি পরিকল্পিত হত্যাকা-। কিন্তু আজো দুটি ঘটনার একটিরও রহস্য উদ্ঘাটান করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এভাবেই অনেক মৃত্যু অন্ধকার রহস্যেই আটকে যায়।

কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি ইয়াছিন ফারুক জানান, ট্রেন দুর্ঘটনায় শুধু রাজধানীতেই গত এক বছরে ৫০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। শীতকালে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ে। শীতকালে কান ঢাকা থাকায় ট্রেনের হর্ন শুনতে না পারা এবং কুয়াশার জন্য ট্রেনের লাইট দেখতে না পারায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। এক শ্রেণির মানুষ চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে ‘বাহাদুরী’ ও ‘সেলফি’ তুলতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পড়ছে। কানে হেডফোন লাগিয়ে তরুণ-তরুণীরা হাঁটতে গিয়েও অহরহ প্রাণ হারাচ্ছে।

"