ভাসানচরে নয়, রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে চায়

প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে এবং আগে থেকে অবস্থান করা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া- টেকনাফে ৩০টি ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে। এদের মধ্যে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু সেখানে যেতে রাজি নন তারা। তারা নাগরিকত্ব নিয়ে মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায়। মিয়ানমার যতদিন তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে না নেয়, ততদিন উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশাপাশি ভাসানচরে তাদের জন্য অস্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবু তারা সেখানে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন।

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ঘরবাড়ি, সাইক্লোন শেল্টারসহ অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। গত ৪ অক্টোবরে সরকার এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করার কথা ছিল। অথচ উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা কোনোভাবেই সেখান থেকে সরতে চান না। রোহিঙ্গা মাঝি সুলতান আহমদ বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, জনমানবহীন ভাসানচরের দ্বীপটি শরণার্থীদের অন্যান্য আশ্রয় শিবির থেকে অনেক দূরে। বন্যায় তা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিপজ্জনক এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সেখানে। এমন জনমানবহীন একটি দ্বীপে আমাদের নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।’ এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এনজিওকর্মী বলেন, ‘ঠেঙ্গারচর স্থানীয়ভাবে ভাসানচর নামেও পরিচিত। এ চরটি দৃশ্যমান হয় ১১ বছর আগে। বর্ষার মৌসুমে তা মারাত্মকভাবে বন্যাকবলিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তাছাড়া নিকটবর্তী বসতি থেকে এই দ্বীপে যেতে সময় লাগে দুই ঘণ্টা। তাই রোহিঙ্গাদের কাছে মানবিক ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়বে।

ভাসানচরে যেতে চায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বালুখালী সি ব্লকের মাঝি শামশু আহমদ জানান, তারা এখানে ভালো আছেন। তাদের কোথাও যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। তাছাড়া সাগর দেখে তারা ভয় পান। মিয়ানমারের বলী বাজার এলাকার বাসিন্দা আবদুল গণি। বয়সের ভারে অনেকটা নুয়েপড়া মানুষটি জানালেন, ভাসানচরে নেওয়ার চেয়ে এখানেই মরে যাওয়া অনেক ভালো। তিনি বলেন, বছরখানেক আগে বর্মি সেনাদের গুলিতে আহত হওয়ার পর বাংলাদেশে এসে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় তার ভাই মোহাম্মদ শফি। সেই স্মৃতি মনে করেই এ মাটি ছেড়ে কোথাও যেতে চান না। মো. লালু নামের এক বয়স্ক রোহিঙ্গা জানান, কিছু মানুষ বলছে তারা ওই জায়গা চেনেন না। তাছাড়া পানি উঠে ডুবে যাবে কি না, সে বিষয়ে তাদের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে। রোহিঙ্গারা কী চাইছে জানতে চাইলে আজিম নামের আরেক রোহিঙ্গা জানান, এখানে থাকবে, না হয় এখান থেকে নিজের দেশে চলে যাবে। এ ছাড়াও ক্যাম্পে তাদের আত্মীয়-স্বজন থেকে আলাদা হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে যেতে অনাগ্রহী বলে জানিয়েছেন অনেকে। আরেক রোহিঙ্গা মাঝি ইউছুপ বলেন, মিয়ানমার সেনারা আমার ভাই, স্ত্রী-সন্তানকে পুড়িয়ে মেরেছে। তাদের সমাধিস্থ করার ভাগ্য হয়নি আমার। আমার মতো হাজারো রোহিঙ্গা নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে পালিয়ে এসেছে। তিনি জানান, উখিয়ার কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় মিলেছে। খাবার মিলেছে। প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবারও কমতি নেই। আন্তর্জাতিক দাতারাও দাঁড়িয়েছে পাশে, এখান থেকে আর অন্য কোথাও নয়। ক্যাম্প মাঝিদের নেতা মো. জাবের জানান, ওই জাগায়াটা কেমন প্রথমে সেটা জানতে হবে। সবাই যদি সিদ্ধান্ত দেয় যে, ওই জায়গাটাই ভালো। তাহলে কোনো সমস্যা নেই।

রোহিঙ্গাদের বাসস্থানের জন্য বনভূমিসহ প্রায় ছয় হাজার একর জমি বরাদ্দ দিয়েছে বাংলাদেশ। উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গাদের রেজিস্ট্রেট ক্যাম্প ছিল আগে থেকেই। ধীরে ধীরে এটি বিস্তৃত হয়েছে বালুখালী, হাকিমপাড়া, জামতলী, শফিউল্লার কাটা, গয়ালমারা, বাঘঘোনা, ময়নাঘোনা, তাজনিমারঘোনা, মধুরছড়া, থাইংখালী। টেকনাফের প্রকৃতি ঢাকা পড়েছে হোয়াইক্যং, লেদা, উনছিপ্রাং, নয়াপাড়া, মুসুনি, হ্নীলার অস্থায়ী শিবিরের কারণে। এসব এলাকার অসমতল ভূমি তাঁবুর শহরে রূপ নিয়েছে। এখানেই গাদাগাদি করে ঠাঁই নিয়েছে লাখো বাস্তুহারা মানুষ। সরকারি হিসেবে কক্সবাজারে মিয়ানমার থেকে আসা নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখেরও বেশি। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বলেন, ‘তাদেরকে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার মূল কাজটি শুরু করার আগে আমাদের একটি পরিকল্পনা আছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও নির্দেশনা আছে তাদের আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য। রোহিঙ্গাদের একটি নির্বাচিত দলকে আমরা সেখানে নিয়ে যাব। সেখানকার সুযোগ সুবিধা দেখে তারা নিজেরাই যেতে আগ্রহী হবে বলে আমার বিশ্বাস।

 

"