প্রত্যাবাসন নিয়ে আবারও মিথ্যাচার করছে মিয়ানমার

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের দাফতরিক ওয়েবসাইটে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির থেকে একটি রোহিঙ্গা পরিবারের রাখাইনে ফিরে যাওয়ার কথা জানানো হলেও বাংলাদেশ বলছে বিষয়টি ঠিক নয়, এটা মিয়ানমারের মিথ্যাচার। মিয়ানমারের দাবি, বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রত্যাবাসন চুক্তির অংশ হিসেবেই যাচাই-বাছাই শেষে ওই রোহিঙ্গা পরিবারকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশ বলছে, আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কোনো রোহিঙ্গা পরিবার মিয়ানমারে ফেরেনি। এটা সে দেশের সরকারের মিথ্যা প্রচার। গত বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের দাফতরিক ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়, গত বুধবার একটি পরিবার রাখাইনে ফিরেছে। রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় আড়াল করে পাঁচ সদস্যের ওই পরিবারকে ‘বাস্তুচ্যুত’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। গ্লোবাল নিউ লাইটস অব মিয়ানমার সূত্রে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পাঁচ সদস্যের একটি বাস্তুচ্যুত পরিবার ১০ অক্টোবর রাখাইনের মংতো জেলার তং পিয়ো লেতওয়ে অভ্যর্থনা কেন্দ্রে ফিরেছে।

প্রত্যাবাসন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, রাখাইনে ফিরতে চাওয়া রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই শেষে তাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা। দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নাগরিকত্বের আবেদন করতে রোহিঙ্গাদের ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) সরবরাহ করার কথা রয়েছে। গ্লোবাল নিউ লাইটস অব মিয়ানমার-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি থেকে ফিরে আসাদের মধ্যে যারা ভেরিফাইড তাদের গ্রহণে প্রস্তুত রয়েছে মিয়ানমার। প্রশাসন বিভাগের উপপরিচালক উ সোয়ে তুন এবং অভিবাসন ও জনসংখ্যাবিষয়ক বিভাগের উপপরিচালক উ থান্ত জিন ৪৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইতনু ও তার পরিবারের সদস্যদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। কর্তৃপক্ষ তাদের জন্য ই-আইডি নিবন্ধন প্রক্রিয়াও পরিচালনা করেছে। এদের মধ্যে যারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে চায় তাদের জন্য ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) এর জন্য আবেদনপত্র ইস্যু করেছে অভিবাসন ও জনসংখ্যাবিষয়ক বিভাগ।

বাংলাদেশ ওই রোহিঙ্গা পরিবারের ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে অবগত নয়। কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেছেন, একটি রোহিঙ্গা পরিবার ফেরত গেছে বলে জানা গেছে, তবে তাদের পৌঁছানোর ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা যায়নি। তিনি আরো বলেন, ‘কেউ চাইলে ফিরে যেতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।’

বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী দিনে ১৫০ রোহিঙ্গাকে গ্রহণ করার কথা ছিল মিয়ানমারের। এজন্য ট্রানজিট ক্যাম্পও বানিয়েছে মিয়ানমার। তবে গত জুনে এএফপির এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেশির ভাগ সময়ই খালি পড়ে থাকে ক্যাম্পগুলো। মিয়ানমারের অভিবাসন কর্মকর্তারা কাগজপত্র নিয়ে এই ট্রানজিট ক্যাম্পে অপেক্ষা করেন। প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করেন সাংবাদিকরা। কেবল রোহিঙ্গাদের দেখা মেলে না সেখানে। মিয়ানমারের অভিবাসনবিষয়ক কর্মকর্তা উইন খাইং সে সময় বলেছিলেন, ‘জানুয়ারি থেকেই আমরা তাদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত।’ তবে আন্তর্জাতিক একাধিক গণমাধ্যম্যের অনুসন্ধানে জানা যায়, রোহিঙ্গারাও নিরাপত্তার অভাবে মিয়ানমারে ফিরতে রাজি হচ্ছে না। মিয়ানমারও নিরাপত্তা নিশ্চিতের শক্তিশালী কোনো আশ্বাস দিতে পারছে না।

কেবল অভিবাসন কর্মকর্তা নয়, স্বয়ং মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চিও শুরু থেকেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বিলম্ব নিয়ে বাংলাদেশের ওপর দোষ চাপিয়ে আসছেন। ১ আগস্ট সিঙ্গাপুরে এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকেই প্রত্যাবাসনকারীদের ফিরিয়ে দিতে হবে। আমরা কেবল সীমান্তে তাদের স্বাগত জানাতে পারি।’ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দাবি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশে অবৈধভাবে পালিয়ে যাওয়া বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, নৌকায় করে বাংলাদেশ পালিয়ে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনায় পড়ে যারা মিয়ানমারের অংশে আটক হয় তাদের ট্রানজিট ক্যাম্পের মাধ্যমে স্বজনদের কাছে পাঠানো হয়েছে। জুনে সাংবাদিকদের সামনে ৯ জন রোহিঙ্গা হাজির করা হয়। দাবি করা হয়, অবৈধভাবে মিয়ানমারে ফিরে আসার চেষ্টা করায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। মুক্তির পর তাদের ট্রানজিট ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের এই দাবি ভুয়া বলে প্রতীয়মান হয়। এই ৯ রোহিঙ্গার কয়েকজন জানান তারা কখনোই বাংলাদেশ যাননি এবং মিয়ানমারের কারাগার থেকে ক্যাম্পে তাদের প্রত্যাবাসন হয়েছে।

জানুয়ারিতে অ্যামনেস্টির সর্বশেষ গবেষণায় রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বহু গ্রাম জ্বালিয়ে ও বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়ার আলামত উঠে এসেছিল। ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী অর্ধশতাধিক গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে বলে দাবি করে মার্কিন মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস। বলা হচ্ছিল, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক বাহিনীর নিধনযজ্ঞ আড়াল করতেই গ্রামগুলোতে বুলডোজার চালানো হয়।

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশের জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার করে না মিয়ানমার। তাদের ‘বাঙালি মুসলমান’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশের বাসিন্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর দেশটির বাসিন্দা হিসেবে রোহিঙ্গাদের যে সবুজ ও গোলাপি পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছিল, তা গুরুত্বহীন হয়ে যায় ৮২ সালের নতুন নাগরিকত্ব আইনে। মিয়ানমারের ইতিহাসে চোখ ফেরালে দেখা যায়, ১৯৮২ সালে তৎকালীন সামরিক জান্তা সরকার নৃগোষ্ঠীভিত্তিক নতুন নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করে। বিতর্কিত ওই বর্ণবাদী নাগরিকত্ব আইনে মিয়ানমারের প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়। গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর নিরীহ রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্ব-পরিকল্পিত সহিংসতা চালায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৭ লাখেরও বেশি মানুষ।

 

"