তিতলির প্রভাব

রোহিঙ্গাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ তলিয়ে গেছে শাহপরীর দ্বীপ

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে দুই দিন ধরে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছে কক্সবাজারের উখিয়ায় আশ্রিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারীরা। একই কারণে জেলার শাহপরীর দ্বীপে তলীয় গেছে শত শত ঘরবাড়ি। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজারের উখিয়ায় ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে উখিয়ায় আশ্রিত রোহিঙ্গাশিবিরে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের অনেকেই ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদফতরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে কক্সবাজারের কিছু এলাকায় প্রভাব পড়েছে। তবে ৪ নম্বর সতর্ক সংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর দেওয়া হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রিতদের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ক্যাম্পের ভেতরে জমেছে কাঁদা-পানি। পিচ্ছিল পথে হাঁটাই দায়। শুক্রবার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বি-ব্লকের অবস্থানকারী মিয়ানমারের বলীবাজার গ্রামের বাসিন্দা হাসমত উল্লাহ জানান, বৃষ্টি হলে কষ্টের পরিমাণ বেড়ে যায়। পানি জমে ঘরের ভেতর পর্যন্ত। ক্যাম্পে বিশুদ্ধ পানির সংকটে অনেকেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ঠান্ডা জ্বর, কাশি। ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুচিডং থেকে আসা সুলতান আহমদ জানান, বৃষ্টি বাড়লে কষ্ট বাড়ে, বাতাসে নড়াচড়া করে ঝুপড়ি ঘর। বৃষ্টিতে পানি আটকানো যায় না। ঘর স্যাঁতসেঁতে হয়ে যায়। রাতে না ঘুমিয়ে বসে থাকতে হয়। রাখাইনের বুচিডংয়ের আইনচং এলাকার কালাচান বিবি জানান, এখানে রোদ হলেও সমস্যা আবার বৃষ্টি হলেও সমস্যা। একটুু ঝড়-বৃষ্টিতেই ঝুপড়িগুলোর ছাউনি উড়ে যায়। তখন বৃষ্টিতে ভিজতে হয়। আবার রোদ হলে গরমে শিশুদের অবস্থা আরো কাহিল হয়ে পড়ে।

বালুখালী রোহিঙ্গাশিবিরের এইচ-১১ ব্লকের মাঝি মো. লালু বলেন, ‘রোহিঙ্গাশিবিরে অধিকাংশ ঘর পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ। ভারী বৃষ্টিতে ঘরে পানি ঢুকে পড়ে। এতে রোহিঙ্গাদের কষ্টের শেষ নেই। এ ব্যাপারে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিজারুজ্জান চৌধুরী বলেন, ‘বৃষ্টিতে যাতে দুর্ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে রোহিঙ্গাশিবিরগুলোর খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।’

শাহ্পরীর দ্বীপে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, ‘তিতলি’র প্রভাবে সৃষ্ট জোয়ারের পানিতে প্রায় তলিয়ে গেছে কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ। দ্বীপের পশ্চিমপাড়ার বেড়িবাঁধ না থাকায় সেখানে শতাধিক ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। আত্মরক্ষার্থে এলাকায় প্রায় অধিকাংশ লোকজন টেকনাফসহ অন্যত্রে আশ্রয় নিয়েছে। তবে এইভাবে চলতে থাকলে আরও দুই শতাধিক ঘর সাগরের তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শাহপরীর দ্বীপ ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল আমিন বলেন, সাগরে জোয়ারের পানিতে দ্বীপের মাঝার পাড়া ও দক্ষিণপাড়ার শতাধিক ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। গত পাঁচ বছর আগে দ্বীপের পশ্চিম দিকের অংশে ৩ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে যায়।

তিনি আরো বলেন, দ্বীপের বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকার ১০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যার আংশিক কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। খোলা বাঁধগুলো নির্মাণ করা না গেলে পুরো দ্বীপ সাগরে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবার তিন দিনেই ঘরবাড়ি হারিয়েছে শতাধিক মানুষ।

এ বিয়ষে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী প্রকৌশলী মোহম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ১০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে শাহপরীর দ্বীপের প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে ১ কিলোমিটারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে দ্বীপের যে খোলা বাঁধ থেকে সাগরের পানি ঢুকছে সেখানে বাঁধ রক্ষায় জিও ব্যাগ বসানো হয়েছিল।

তিনি আরো বলেন, জোয়ারের পানিতে দক্ষিণ এক কিলোমিটারও উত্তরের এক কিলোমিটাররের ভেতর যেসব ঘরবাড়ি রয়েছে সেখানে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে অনেক ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। তবে যে-স্থান থেকে পানি ঢুকছে সেখানে আবারও বালির জিও ব্যাগ ও বালি ভর্তি বস্তা বসানো হবে। পুরো তিন কিলোমিটারের কাজের মেয়াদ ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত, তবে আবহাওয়া ভালো থাকলে সময়ের আগে কাজ শেষ সম্পূর্ণ করা হবে।

সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর হোসেন জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সহযোগিতা চেয়ে তালিকা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

এদিকে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রবিউল হাসানের নেতৃত্বে একটি দল শাহপরীর দ্বীপ সরেজমিনে গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

 

"