জড়িতদের রক্ষায় সাজানো তদন্ত, আলামত নষ্ট

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় আসামিদের রক্ষা করতে আলামত নষ্ট করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, তদন্তের পদে পদে ছিল বাধা। ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে একের পর এক অযৌক্তিক ও মিথ্যা সব তথ্য প্রমাণ হাজিরের চেষ্টা করা হয়। ঘটনার শুরু থেকেই হোতাদের আড়াল করতে তদন্তের গতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তদন্তের নামে বিভিন্ন সময় নানা ‘আষাঢ়ে গল্প’ হাজির করে প্রথম থেকেই বিষয়টিকে বিতর্কিত করার কাজ শুরু হয় সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। এক্ষেত্রে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ অনেকে প্রভাবিত করেছেন।

ক্ষমতায় থাকা বিএনপি ঘটনার গুরুত্বকে নষ্ট করতে হামলার শিকার আওয়ামী লীগের দিকেই সন্দেহের আঙুল তোলে। আওয়ামী লীগও ভয়ঙ্কর এই হামলার জন্য বিএনপিকে দোষারোপ করে বক্তৃতা-বিবৃতি দিতে শুরু করে। ঘটনার পর দিনই শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের বলেন, হামলার সঙ্গে সরকার জড়িত। জোট সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও নেতা তাদের বক্তৃতায় আওয়ামী লীগ নিজেরাই জড়িত বলে প্রচার চালান। হামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত বলেও তখন একটা মহল থেকে প্রচার চালানো হয়।

কিছুদিন পর দৃশ্যপটে হাজির করা হয় ‘জজ মিয়া উপাখ্যান’। ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর বাড়ি থেকে জজ মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে সিআইডি। ১৭ দিন রিমান্ডে থাকার ২৬ জুন আদালতে ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ দেন জজ মিয়া। একইভাবে ওই বছরের নভেম্বরে আবুল হাসেম রানা ও শফিক নামের আরো দুই যুবকের কাছ থেকে প্রায় একই রকম সাজানো জবানবন্দি আদায় করা হয়। এই জজ মিয়াকে দিয়েই গ্রেনেড হামলার জবানবন্দি আদায় করে তদন্তের নামে ‘আষাঢ়ে গল্প’ প্রচার করেছিলেন মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি আবদুর রশিদ ও তৎকালীন বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন। সিআইডির এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনিও এই সাজানো ছকে কথিত তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যান। এই গল্প সাজানোর ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাদের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন।

এদিকে জজ মিয়ার ওই সাজানো জবানবন্দি নিয়ে তখনই গণমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছিল। আওয়ামী লীগ বলেছিল, তাদের ওপর দোষ চাপানোর কৌশল হিসেবেই এই স্বীকারোক্তি আদায়ের কথা বলা হচ্ছে। ঘটনার প্রায় ২ বছর পর ২০০৬ সালের আগস্টে এই নাটকের পেছনের ঘটনা ফাঁস করে দেন জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন। তিনি গণমাধ্যমের কাছে বলেন, জজ মিয়াকে গ্রেফতারের পর থেকে সিআইডি তার পরিবারকে প্রতি মাসে ভরণপোষণের টাকা দিয়ে আসছে। জজ মিয়াকে গ্রেনেড হামলা মামলায় রাজসাক্ষী করতে সিআইডির প্রস্তাবের কথাও ফাঁস করে দেন তিনি।

সাজানো তদন্তের অংশ হিসেবে ২০০৫ সালের ২৩ আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। হুমকিদাতা হিসেবে ২৫ আগস্ট গ্রেফতার করা হয় শৈবাল সাহা পার্থ নামের এক যুবককে। পার্থ যেহেতু ভারতে লেখাপড়া করেছেন, তাই তাকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার চর হিসেবে প্রমাণেরও চেষ্টা হয়। সাত মাস পর কারাগার থেকে বেরিয়ে পার্থ জানান, তাকে ফাঁসানোর জন্য ব্যাপক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। এরপর মগবাজার এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা মোখলেছুর রহমানকেও এই মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়। পরে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি অভিযোগ করেন, সিআইডি তাকে গ্রেনেড হামলায় জড়াতে না পেরে সাক্ষী হওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল।

এদিকে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে এই মামলার সুষ্ঠু তদন্তের উদ্যোগ নেয়। সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবির দীর্ঘ তদন্ত শেষে মামলা দুইটির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেন। এতে হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি হান্নান ও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। একই সঙ্গে জোট সরকারের আমলে গ্রেফতার করা জজ মিয়া, পার্থসহ ২০ জনের অব্যাহতি দেওয়া হয়।

গ্রেনেড হামলার পর আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থা ইন্টারপোল ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের বিশেষজ্ঞরাও ঢাকায় আসেন। তারা মূলত বিস্ফোরণ ও বিস্ফোরকের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়েছেন। কিন্তু তৎকালীন জোট সরকার বিষয়টি এমনভাবে প্রচার করে, যেন ঘটনার আন্তর্জাতিক তদন্ত হচ্ছে জনমনে এমন ধারণা সৃষ্টি হয়।

এ মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি কর্মকর্তা আবদুল কাহার আকন্দের দেওয়া সম্পূরক অভিযোগপত্রে আলামত নষ্টের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। আসামিদের রক্ষায় কীভাবে মামলার আলামত নষ্ট করে দেওয়া হয়, রাষ্ট্রপক্ষের সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান আদালতকে বলেছেন। তারপরও রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের কাছে ২২৫ জন সাক্ষীর মাধ্যমে এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা ছাড়াও বিভিন্ন আলামত আদালতে উপস্থাপন করতে পেরেছেন।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ ২০১১ সালের ৩ জুলাই আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে তিনি ঘটনার পর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত ও আলামত নষ্টসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। অভিযোগপত্রের একটি অংশে তিনি উল্লেখ করেন, ‘বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসভায় আসামি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক ডিসি (পূর্ব) মো. ওবায়দুর রহমান খান ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেনেড আক্রমণ চালানোর সুবিধার্থে ও রক্ষার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেননি। এ ঘটনায় ব্যবহৃত অবিস্ফোরিত তাজা গ্রেনেড আলামত হিসেবে জব্দ করার পরও সেটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেননি। সেনাবাহিনীর মাধ্যমে গ্রেনেডগুলো ধ্বংস করিয়েছেন। আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল, রাবার বুলেট নিক্ষেপের মাধ্যমে হোতাদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের লাঠিপেটা ও গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় মামলা দিয়ে আদালতে পাঠান। হতাহতদের আত্মীয়স্বজন বা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে এজাহার না নিয়ে পুলিশকে বাদী করিয়ে মামলা রেকর্ড করিয়েছেন।’

 

"