কিছু বিষয়ে অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও খুশি বিশিষ্টজনরা

অপকর্মের যে বিচার হয় সেটা প্রতিষ্ঠিত হলো

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

১৪ বছর আগে আওয়ামী লীগের সমাবেশে বর্বরোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার রায় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। বিশেষ করে যার বিরুদ্ধে এই হামলার মূল পরিকল্পনার অভিযোগ ছিল এবং যাকে এই মামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছিল সেই বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডনে পলাতক তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ায় বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। স্বয়ং বর্তমান সরকারের মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও তারেক রহমানের এমন সাজায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তারেক রহমানের পাশাপাশি বিএনপির অপর নেতা হারিছ চৌধুরীরও সর্বোচ্চ সাজা না হওয়ায় অসন্তুষ্ট এ হামলায় আহতরাও। বিশেষ করে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এই হামলায় অভিযুক্ত না হওয়ায় অসন্তুষ্টি এসেছে সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া এ হামলার তথ্য জানবেন না তা অবিশ্বাস্য। তারা রাষ্ট্রপক্ষকে খালেদা জিয়াকে শাস্তির আওতায় আনার জন্য আপিল করার অনুরোধ জানান।

এমন প্রেক্ষাপটে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এই মামলার রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত তিন আসামি তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী ও কায়কোবাদের মৃত্যুদ-ের জন্য আপিল করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এসব মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মতে, হামলার হোতা তারেক রহমানের মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ২১ আগস্ট চালানো গ্রেনেড হামলার মাস্টারমাইন্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত ছিল। তাদের মতে, এই নৃশংস হত্যাকা-ের মূল লক্ষ্য ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই হামলার মাস্টারমাইন্ড কে তা দেশের জনগণ জানে। বিষয়টি প্রকাশ্য দিবালোকের মতো সত্য। তারা এমনো বলেছেন, মুফতি হান্নান স্বীকারোক্তি দিয়েছেন অপারেশনের পূর্ব মুহূর্তে তারেক রহমানের অনুমতি নেওয়া হয়েছে। হাওয়া ভবন সে সময় ছিল বিকল্প পাওয়ার হাউস। ফলে তারা এ রায়ে অখুশি না হলেও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি।

তবে বিলম্বে হলেও এই মামলার রায় হওয়ায় খুশি বিশিষ্টজনরা। তাদের মতে, যাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি উঠছে, সে ব্যাপারে নিশ্চয় আপিল বিভাগ দেখবেন। তবে এই রায় হওয়ায় দেরিতে হলেও যে অপকর্মের বিচার হয় এবং দেশে আইনের শাসন রয়েছে তা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন গতকাল বুধবার সকালে ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ১৪ বছর আগে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীবিরোধী সমাবেশে নৃশংস গ্রেনেড হামলার ঘটনার মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদ-ের আদেশ দেন। খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড । এছাড়া এ মামলার আসামি ১১ সরকারি কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রায় নিয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় প্রতিদিনের সংবাদকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলার রায় হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া নিষ্পত্তির মধ্য দিয়েই এ রায় এসেছে। সুতরাং রায় ঠিকই আছে। তবে যেসব অভিযোগ উঠছে, যেমন তারেক রহমানসহ আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে যে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি আসছে, এমনকি পর্যবেক্ষণেও যে তথ্য এসেছে, তাতে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই রায়ের কিছু ব্যাপারে অসন্তুষ্টি থাকতে পারে।

তবে আমি বলব এই হামলার মধ্য দিয়ে বিএনপি-জামায়াত আওয়ামী লীগের সঙ্গে যে আচরণ করল, তা কিছুতেই রাজনৈতিক শিষ্টাচার নয়। বরং এ ধরনের আচরণের মধ্য দিয়ে দেশে অরাজনৈতিক ও বিশৃঙ্খল রাজনীতির জন্ম নেবে। যেহেতু বিচার হয়েছে, ভালো রকমের ইতিহাসের শিক্ষা তৈরি হলো। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কেউ এমন করার সাহস দেখাবে না। এই রায়ের মধ্য দিয়ে আইনের শাসনের জন্য ভালো হলো। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পেল।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মীজানুর রহমান বলেন, বিভিন্ন ধরনের সাজা নিয়ে যেসব কথা উঠছে সেগুলো আইনের কথা আইন দেখবে। তবে এটা ভালো যে অভিযুক্তদের সবারই কোনো না কোনো ধরনের সাজা হয়েছে।

‘এই হামলায় তিন ক্যাটাগরির লোক ছিলÑ যারা গ্রেনেড ছুঁড়েছে, চক্রান্ত করেছে ও হামলায় সহযোগিতা করেছে। যদি এমন হয় হামলার পরিকল্পনাটা তারেক রহমানের মাথা থেকে এসেছে তা হলে সেটা উচ্চ আদালত দেখবেন। আবার যদি জঙ্গিগোষ্ঠীর মাথা থেকে আসে ও তাদের হাওয়া ভবন থেকে শেল্টার দেওয়া হবে, এমন আশ্বাস দেওয়া হয়, সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে’Ñ মত দেন এই বিশ্লেষক।

এই উপাচার্য বলেন, এটা ছিল বিলম্বিত বিচার। দেরিতে হলেও রায় হয়েছে। তার মানে অপকর্ম করলে বিচার যে হয়, শাস্তি পেতে হয়Ñ সেটা প্রতিষ্ঠিত হলো। তবে গ্রেনেড হামলা পরবর্তী যে কর্মকা- তাতে স্পষ্ট যে রাষ্ট্রযন্ত্র এই হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল। আমরা দেখেছি হামলার পর কীভাবে মুহূর্তেই রক্ত ধুয়ে ফেলা হয়েছে, আলামত নষ্ট করা হয়েছে, আলামত হিসেবে না রেখে গ্রেনেডগুলো নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, হাসপাতাল থেকে আহতদের চিকিৎসা না করে বের করে দেওয়া হয়েছে, টেলিভিশন থেকে হামলার সব ফুটেজ নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এমনকি মুহূর্তে পাসপোর্ট করে রাতারাতি হামলার মূল হোতা তাজউদ্দিনকে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ এই হামলার সঙ্গে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান জড়িত ছিল। তার মানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া সব জানতেন। সুতরাং তাকে যদি এ হামলায় অভিযুক্ত করা না হয় তা হলে সেটা যথার্থ হবে না। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী এমন ঘটনার তথ্য জানবেন না তা অবিশ্বাস্য।

 

"