আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস

তরুণদের প্রতি ৫ জনের ১ জন মানসিক রোগী

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

পাঠান সোহাগ

দেশে প্রতি পাঁচজনের একজন তরুণ মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন। এদের মধ্যে ৮ দশমিক ৪ জনের অবস্থা উদ্বেগজনক, ৪ দশমিক ৬ জন বিষণœতায় এবং ১ দশমিক ১ শতাংশ গুরুতর মানসিক রোগে ভুগছেন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত পোস্টার, বুলেটিন ও বিভিন্ন সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের দেওয়া তথ্য মতে, দিন দিন দেশে মানসিক রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার সাড়ে ৮ লাখ তরুণ এ রোগে ভুগছেন। এ ছাড়া সব মিলিয়ে দেশে আড়াই কোটির ওপরে এ রোগীর সংখ্যা। এদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ আত্মহত্যা। বাংলাদেশে আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার প্রবণতা একটি অন্যতম সমস্যা। প্রতি বছর বিশ্বে আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করেন। তার মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগের বেশি হচ্ছে তরুণ। আর বাংলাদেশে প্রতি বছরে গড়ে ১০ হাজার লোক আত্মহত্যা করেন।

দেশের এমন পরিস্থিতিতে নানা সমস্যায় জর্জরিত রয়েছে দেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাত। দেশে এ-সংক্রান্ত দুটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, একটি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং অন্যটি পাবনা মানসিক হাসপাতাল। চিকিৎসক, জনবল সংকট ও তদারকির অভাবে এই দুই প্রতিষ্ঠানে রয়েছে নানা সংকট।

আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘পরিবর্তনশীল বিশ্বে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য।’ দিনটি পালন করতে ডব্লিউএইচওর সহায়তায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আলোচনা সভা, র‌্যালি, ক্রোড়পত্র প্রকাশের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ এ ব্যাপারে বলেন, পরিবর্তনশীল বিশ্বে মানসিক রোগের ধরন পাল্টেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে প্রথম গুরুত্ব দিচ্ছি সাইবার বুলিং (টিএনএজ পর্নোগ্রাফি, শিশুদের প্রতি ভাইয়োলেন্স বা অ্যাবইউজ), দ্বিতীয়ত আত্মহত্যা, তৃতীয়ত ট্রমা (মানসিক বা শারীরিক আঘাত), চতুর্থ সাধারণ অসুস্থতা (ডিপ্রেশন, বিষণœতা, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার) ইত্যাদি। এই চারটাই মানসিক রোগের প্রধান কারণ।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক জরিপে গেছ, দেশে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে মানসিক রোগীর হার ১৬ দশমিক ১ শতাংশ। আর কমিউনিটি জরিপ অনুসারে এই হার ৩২ শতাংশ। ১৮ বছরের নিচে অর্থাৎ শিশু-কিশোরদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। মোট আক্রান্তের শতকরা ১৯ ভাগ নারী। আর দেশে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারী পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে শতকরা ৪৩ ভাগ নারী মানসিক চাপে ভুগছেন। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য দেশে মোট ২৫০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ৫৭ জন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রয়েছেন। সারা দেশে মাত্র সরকারি বেসকারি পর্যায়ে ২২০ থেকে ২৫০ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন।

অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারিভাবে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, মানসিক হাসপাতাল পাবনা, মনোরোগ বিভাগ বিএসএমএমইউ, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ থাকা মেডিকেল কলেজসমূহ ও সম্মিলিত সামরিক হাসাপাতালে খুব সীমিত পরিসরে এ চিকিৎসা দেওয়া হয়। অনেক জেলা হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ মানসিক চিকিৎসক নেই। এমনকি ঢামেক ও মিডফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোনো পূর্ণ অধ্যাপকের পদ নেই। আমাদের এখানে অধ্যাপক আছে মাত্র ৫ জন। রাজশাহীতে আছে ১ জন। সব মিলে দেশে সরকারি হাসপাতালে ১০ থেকে ১৫ জন অধ্যাপক আছে। সরকারি বেসকারিভাবে দেশে সব মিলিয়ে ২৫০ জনের মতো সাইকিয়াস্ট্রিস্ট আছে।

অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ মানসিক রোগ চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। জেলা উপজেলা হাসপাতালে সাইকিয়াস্টিটের কোনো পদই নেই। মেডিকেল কলেজে পদ তৈরি প্রক্রিয়াধীন আছে। বর্তমানে বিএসএমএমইউ, মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও সিলেট এমএমজি ওসমানী হাসপাতাল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় মানসিক স্বাস্থ্য-২০১৪ নামে একটি খসড়া আইন করা হলেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে ‘ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব মেন্টাল হেলথ’-এর উদ্যোগে ১৯৯২ সাল থেকে সারা বিশ্বে প্রতিবছরের ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়ে আসছে।

"