কানফাটা শব্দ

‘যেন কেয়ামত নেমেছিল’

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

কাইয়ুম আহমেদ

‘একটা ছোট্ট শব্দ, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে এমন ছোটখাটো দুই-একটি শব্দ অস্বাভাবিক নয়। তাই ভয় বা আতঙ্ক তখনো ছড়ায়নি। পর মুহূর্তেই একই ধরনের আরেকটি শব্দ। তখন সতর্ক হয় সবাই। এরমধ্যে আরো কয়েকটি শব্দ, কিছু সময় বাদে শোনা গেল বিকট আওয়াজ। সেই কান ফাটা শব্দের আতঙ্কে হুড়োহুড়ি, দিগি¦দিক দৌড়াচ্ছে সবাই, যেন আকাশ ভেঙে কেয়ামত নেমেছে। কে কাকে ফেলে আগে স্থান ত্যাগ করবে সেই চেষ্টা। লোকজনের ধাক্কায় পড়ে যাই। তারপর আমার ওপর দিয়ে ছুটে যায় কত লোক। ওঠে দাঁড়াবারও শক্তি ছিল না। পরে জানা গেল সেই নৃশংস ঘটনার কথা। আসলে সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করাও কষ্টের।’ এখন আমি সেই আঘাত নিয়ে বেঁচে আছি। স্পাইনাল কর্ডে আঘাত লাগে। সেই আঘাতের কারণে এখন শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। মনে হয়, কেউ হাত-পায়ের আঙুলে সুঁচ ঢুুকিয়ে দিচ্ছে। পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা। বলছিÑ ২০০৪ সালে ২১ আগস্টে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনের গ্রেনেড হামলার কথা। আমি সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলাম দলীয় কর্মী হিসেবে। সেদিন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে জড়ো হয়েছিলেন সংবাদকর্মীরা। তারা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন তাদের দেখা সেদিনের সেই নৃশংস ঘটনা। বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে সেখানে হাজির হন সংবাদকর্মীরা। সাড়ে ৪টার কয়েক মিনিট আগে বক্তব্য দিতে ‘ট্রাকমঞ্চে’ উপস্থিত হন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ঘটে ১৫ আগস্টের পর ইতিহাসের আরেকটি নৃশংস ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শী সংবাদকর্মীরা সেই ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন তাদেরই সহকর্মীদের কাছে। তারা সেদিন সেখানে দেখেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা ঘাটতি। দেখেছেন লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের নির্মম ঘটনাও।

সেদিন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে নিউজ কভারেজের জন্য গিয়েছিলেন চ্যানেল আইয়ের তৎকালীন প্রতিবেদক আশরাফুল আলম খোকন। তিনি এখন প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেসসচিব। গ্রেনেড হামলায় আহতদের মধ্যে তিনিও একজন। আশরাফুল আলম খোকন বলেন, ‘সেদিন দেখেছি, এত বড় একটি সমাবেশে পুলিশের উপস্থিতি ছিল না। নিরাপত্তারও বালাই ছিল না বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে। এটা প্রমাণ করে সেদিনের ঘটনা বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে হয়েছে।’

খোকন বলেন, ‘আমি গ্রেনেড হামলায় আহত হই। সহকর্মীরা আমাকে চিকিৎসাসেবা দিতে প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়। সেখানে আহত-নিহতদের ভিড় দেখে আমাকে দেরি না করে নিয়ে যাওয়া হয় হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। প্রায় ৪০ মিনিট আমি হাসপাতালে পড়ে আছি। আমার চিকিৎসা শুরু হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ওপরের নির্দেশ নেই, তাই চিকিৎসা শুরু করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে আমার শরীরের নিচের অংশ প্রায় নিস্তেজ। আমার সহকর্মীরা পীড়াপীড়ি করলে ৪০ মিনিট পরে শুরু হয় চিকিৎসা।’ খোকন বলেন, ‘অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পরও যদি ওপরের নির্দেশে চিকিৎসা নিতে হয়, তাহলে আরো স্পষ্ট হয়ে যায় সরকারের মদদের কথা।’

সেদিন ট্রাকমঞ্চের ওপরে ছিলেন ফটো সাংবাদিক আবু তাহের খোকন। তার দৃষ্টিতে সেদিন বিকেলে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ছিল মৃত্যুপুরী। তিনি বলেন, ‘তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য প্রায় শেষ। কিন্তু ভালো ছবি আমরা নিতে পারিনি। তাই চিৎকার করে আমিসহ অন্য ফটো সাংবাদিকরা নেত্রীকে (শেখ হাসিনা) বললাম, আমাদের ভালো ছবি হয়নি। এরপরই তিনি ছবির জন্য আমাদের খানিকটা সময় দিলেন। এরমধ্যেই শব্দ হলো, মঞ্চের খুব কাছে এই শব্দ। পরেই আরেকটি শব্দ। এরপর বিকট শব্দ, তখন সজাগ-সতর্ক হই। সবগুলোই ট্রাকমঞ্চের আশপাশে। আমি তখন ট্রাকমঞ্চে শুয়ে পড়ি। দু’হাত উঁচু করে ছবি তুলছি। ততক্ষণেও ধারণায় আসেনি, ট্রাকমঞ্চের নিচে মুত্যুপুরী রচনা হয়েছে। এর মধ্যেই দেখি, ট্রাকমঞ্চে থাকা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা (প্রয়াত) সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের শরীর থেকে রক্তের ফিনকি। আমার জামাও রক্তে ভেজা। শব্দের মধ্যেই দেখি, ট্রাকমঞ্চে নেত্রীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নেতাদের মানবঢাল। মোহাম্মদ হানিফ, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী, কাজী জাফরউল্যাহসহ অন্য নেতারা আড়াল করে রেখেছেন শেখ হাসিনাকে। পরে তারা মানবঢাল তৈরি করে শেখ হাসিনাকে ট্রাকমঞ্চ সংলগ্ন তার ব্যক্তিগত গাড়িতে তুলে দেন। এ সময় আরেকটি গ্রেনেড তার গাড়ির সামনেই বিস্ফোরিত হয়। এতে একজন নিরাপত্তাকর্মী মারা যান। মানবঢাল তৈরি করা নেতারাও আহত হন। কিন্তু বেঁচে যান সন্ত্রাসীদের টার্গেট শেখ হাসিনা। তার গায়ে একটি স্প্রিন্টারও লাগেনি। এটা আল্লাহর অশেষ রহমত।’

আবু তাহের খোকন বলেন, ‘ঘটনা যা দেখেছি তাতে শেখ হাসিনার বেঁচে যাওয়া মানে আল্লাহ তাকে নিজ হাতে বাঁচিয়েছেন। একের পর এক গ্রেনেডের শব্দ পেলেও ট্রাকমঞ্চ থেকে নামিনি। নেত্রীর গাড়ি যখন চলে গেল তখন মঞ্চ থেকে নেমেছি। আর নেমেই হতভম্ব হয়ে যাই। চারদিকে আহতদের আহাজারি। সেখানে পড়ে থাকা সবাইকে মনে হয়েছে নিহত। আর একটাই শব্দ শুনেছি, আমাকে একটু ধরো, বাঁচাও, বাঁচাও।’

তিনি বলেন, ‘এত বড় একটি ঘটনা ঘটে গেল। কিন্তু যতক্ষণ ছিলাম পুলিশ দেখিনি। সংবাদকর্মী হিসেবে মনে হয়েছে, নিরাপত্তার অভাব ছিল সেখানে। লোমহর্ষক এই ঘটনার খুব কাছে ছিলাম। কিন্তু আমিই একমাত্র ব্যক্তি বেঁচে গেছি এবং কোথাও কোনো আঘাত লাগেনি।’

বিডি নিউজের সাংবাদিক সুমন মাহবুব বলেন, ‘এখনও চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই- আইভি রহমানের সেই দৃষ্টি, আদা চাচার নিথর দেহ, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাশ, চাপ চাপ রক্ত আর মানুষের আর্তচিৎকার। যা দেখেছি সেদিন, তা বোঝানো যাবে না। শ শ জোড়া জুতা, স্যান্ডেল রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। পড়ে রয়েছে মানুষের নিথর দেহ। রক্ত আর আহতদের আর্তনাদে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। বঙ্গবন্ধু এভিনিউর দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম শেখ হাসিনার বুলেট প্রুফ গাড়িটি নেই। ট্রাকের ওপর কয়েকজন নেতা পড়ে রয়েছেন। আবদুল জলিলকে উঠে বসতে দেখলাম। তার সাদা পাঞ্জাবি জুড়ে লাল লাল ছোপ। কয়েকজন মিলে তাকে ধরে ট্রাক থেকে নামিয়ে আওয়ামী লীগ অফিসে নিয়ে গেল। এরপর ট্রাক থেকে নামানো হলো সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে। তারও শরীর রক্তে লাল। রমনা ভবনের সামনে দুটি লাশ পড়ে রয়েছে। একজনের পা নেই। চারদিকে রক্ত। তার পাশেই আরেকটি মৃতদেহ। মনে হচ্ছিল, তার পুরো শরীর কেউ থেঁতলে দিয়েছে। একটু সামনেই রমনা ভবনের এক দোকানের সামনে দেখতে পেলাম আদা চাচার নিথর দেহ, স্থিও দৃষ্টি। যেন দোকানের শাটারে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছেন।

ট্রাকের পাশে যেতেই দেখলাম আইভি রহমান বসে আছেন। কিন্তু তার পা দু’খানি অদৃশ্য। মনে হলো, আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। কিন্তু চোখের কোনো ভাষা নেই।’

"